বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতার লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিকে ঘিরে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির পর এই নতুন সমঝোতা কেন হলো, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে এলপিজি ও এলএনজির জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় বিকল্প উৎস হতে পারে। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি হবে, যা সংকটকালে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাবে।
সমঝোতার বিস্তারিত
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্থানীয় সময় ১৪ মে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সমঝোতা স্মারক জ্বালানি পাওয়ার উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে। সাশ্রয়ী মূল্য ও টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি এটি দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করবে।
এই সমঝোতার আওতায় তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় ও জৈবশক্তি বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময় এবং গবেষণা সহজ হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক তামিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ ও আমদানির আরও একটি জায়গা তৈরি হওয়া বাংলাদেশের জন্য ভালো। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, চুক্তি বা সমঝোতার নামে বাংলাদেশকে যদি জ্বালানি কিনতে বাধ্য করা হয়, সেটি দেশের জন্য ভালো হবে না।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প উৎস থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রেক্ষাপট ও পূর্ববর্তী চুক্তি
চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করে। সেই চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার কথা বলা আছে। এছাড়া বাংলাদেশের গ্যাস খাতে মার্কিন কোম্পানির আগে থেকেই আধিপত্য রয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ যত এলপিজি আমদানি করেছে, তার ৪০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
জ্বালানি বিষয়ক সাময়িকী এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রই বড় খেলোয়াড় এবং তারা নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করতে চাইছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে আহরিত গ্যাসের ৪০ ভাগই মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালনা করে।
মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা ও বিকল্প উৎসের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কাতার চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করতে পারেনি, যা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার প্রভাবও পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। এমন প্রেক্ষাপটে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সমঝোতা সেই বিকল্প উৎস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।



