২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণে সংখ্যা ও উপাত্তের প্রাধান্য দেখা গেলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বাজেটকে শুধু আঙ্কিক কাঠামো নয়, বরং মানবিক উন্নয়নের দর্শন ধারণ করতে হবে। সেলিম জাহান, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক, তাঁর বিশ্লেষণে বলেছেন, ‘বাজেটের চূড়ান্ত বিচার হবে মানুষের যাপিত জীবনে কতটা স্বস্তি আসে, তার জীবনমান কতটা উন্নীত হয়।’
বাজেটের উন্নয়নদর্শন ও লক্ষ্যমাত্রা
এ বছরের বাজেটের শিরোনাম ‘একটি মানবতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’। এই শিরোনাম থেকে তিনটি বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে: প্রথমত, বাজেট মানববাদী কল্যাণমূলক রাষ্ট্রমুখী হবে; দ্বিতীয়ত, মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই এর মূল দর্শন; তৃতীয়ত, উন্নয়নে সবার অংশগ্রহণ ও সুফলের সমবণ্টন নিশ্চিত হবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই উন্নয়নদর্শনের সঙ্গে বাজেটের লক্ষ্য ও কৌশল কতখানি সংগতিপূর্ণ?
বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বর্তমান অর্জিত প্রবৃদ্ধি হারের প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। সেলিম জাহান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক শ্লথতার পরিপ্রেক্ষিতে এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো কি বাস্তবসম্মত?’ তিনি সতর্ক করে বলেন, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা জনপ্রত্যাশা বাড়িয়ে দেবে, যা অর্জিত না হলে সরকারের প্রতি আস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এবং নবীন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হবে।
বাজেটের ভারসাম্য ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
বর্তমান বাজেটকে কঠিন ভারসাম্য প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একদিকে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে বাজেটকে রক্ষণশীল হতে হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক শ্লথতা কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনা দিতে হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তরায় চিহ্নিত করা হয়েছে: বাস্তবায়নের সনাতন ও নবতর সমস্যা, অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা এবং বৈশ্বিক সংকট।
রাজস্ব আহরণের দুর্বল ভিত্তি ও কাঠামোর কারণে সরকারকে দেশি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় পরিমাণ ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমে যাবে। বৈদেশিক ঋণ ও ঋণ পরিশোধের বোঝা অত্যন্ত বেশি, আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বেড়েছে এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রসার ভবিষ্যতে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার ধাপ হিসেবে বাজেট
বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটকে তার পাঁচ বছরের বৃহত্তর পরিকল্পনার নিরিখে দেখতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের প্রতিটি বাজেট সেই মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার একেকটি ধাপ। সেলিম জাহান বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি, প্রতিবছরের বাজেটই পাঁচ বছরের পরিকল্পনা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে।’
আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশকে ত্রিমুখী সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে: চলমান সমস্যা (দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক শ্লথতা, মূল্যস্ফীতি, কর্মহীনতা), ঘনীভূত সমস্যা (অসমতা, নারীর প্রতি সহিংসতা, আর্থিক খাতের সংকট, পরিবেশদূষণ) এবং আবির্ভূমান সমস্যা (বৈশ্বিক সংকট, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি, ভূ-অর্থনৈতিক অন্তরায়, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ)।
সংস্কার ও নতুন সম্ভাবনার প্রয়োজন
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে রাজনৈতিক, আর্থিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কারে। অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ অতি জরুরি; সৃজনশীল অর্থনীতি, সুনীল অর্থনীতি ও সবুজ অর্থনীতির সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। বর্তমান বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে এসব সুযোগ গ্রহণ করতে মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রয়োজন, যার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, সংস্কার ও সেবার গুণগত মানের উন্নতি জরুরি।
কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক গণতন্ত্র যথেষ্ট নয়, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ তাই অপরিহার্য। সংখ্যার সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে।



