ইসলামের স্বর্ণযুগে আলেমরাই ছিলেন সেরা ব্যবসায়ী, জানুন ইতিহাস
ইসলামের স্বর্ণযুগে আলেমরাই ছিলেন সেরা ব্যবসায়ী

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস শুধু কিতাব আর মাদ্রাসার চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। জ্ঞান–বিজ্ঞানের চর্চার পাশাপাশি সেখানে চলেছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বহু মুহাদ্দিস, ফকিহ ও দার্শনিক একই সঙ্গে সফল ব্যবসায়ী ছিলেন—ইমাম জাহাবির সিয়ারু আলামিন নুবালা ও ইমাম সামআনির আল-আনসাব-এর মতো জীবনীগ্রন্থ ঘাঁটলে এই দিক স্পষ্ট হয়।

গবেষণায় আলেমদের পেশার চিত্র

মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে আলেমদের ব্যবসা-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গবেষণা করেছেন ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী হাইয়িম জে কোহেন। ইতিহাসবিদ অলিভিয়া রেমি কনস্টেবল তাঁর আন্দালুস বাণিজ্য–সংক্রান্ত গবেষণায় কোহেনের এই পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করেছেন। গবেষণায় হাজারো আলেমের জীবনী পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যাঁদের পেশার বিবরণ পাওয়া যায়, তাঁদের একটি বড় অংশ টেক্সটাইল, কৃষি-শস্য, ধাতু ও জুয়েলারি, সুগন্ধি, চামড়া, বই-প্রকাশনা, ব্যাংকিং ও সাধারণ বাণিজ্যের মতো বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন—টেক্সটাইল ও কাপড়শিল্প ছিল সবচেয়ে বড় খাত। (জার্নাল অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল হিস্ট্রি অব দ্য অরিয়েন্ট, ১৩/১৬-৬১, দ্য ইকোনমিক ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড দ্য সেক্যুলার অকুপেশনস অব মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্টস অ্যান্ড ট্রেডিশনিস্টস ইন দ্য ক্ল্যাসিক্যাল পিরিয়ড অব ইসলাম, ১৯৭০ খ্রি.)

মক্কার বাণিজ্যিক ঐতিহ্য

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই বাণিজ্যের সঙ্গে এই সমাজের সম্পর্ক গভীর। মক্কা নগরী ছিল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং কোরআনে সুরা কুরাইশে মক্কার কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য সফরের উল্লেখ আছে। নবুয়ত-পূর্ব জীবনে খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের (রা.) বাণিজ্যিক প্রতিনিধি হিসেবে মহানবী (সা.) সিরিয়ায় ব্যবসা পরিচালনা করেছিলেন এবং তাঁর সততার কারণে খাদিজা তাঁকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেছিলেন। সাইব ইবনে আবি সাইবের সঙ্গেও তাঁর প্রাক্‌-ইসলামি যুগে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাহাবিদের সম্পদ ও দানশীলতা

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) খলিফা হওয়ার পরও কিছুকাল কাপড়ের ব্যবসা চালিয়েছিলেন, পরে সাহাবিদের অনুরোধে রাষ্ট্রীয় কাজে সময় দেওয়ার জন্য তা ছেড়ে দেন এবং বায়তুল মাল থেকে একটি নির্ধারিত ভাতা গ্রহণ করতেন। তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) ছিলেন কোরাইশদের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়ী। তাবুক অভিযানের সময় (৯ হি.) তাঁর বিশাল আর্থিক ও সামগ্রিক অনুদানের ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে সুপরিচিত। আরেকজন ব্যবসায়ী সাহাবি হলেন আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)। তিনি মদিনায় শূন্য হাতে হিজরত করে এসে ব্যবসার মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন এবং তাঁর দানশীলতায় প্রবাদপ্রতিম হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া সাহাবি বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী জুবাইর ইবনুল আওয়ামের মোট রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচ কোটি দিরহাম (তাঁর ঋণ পরিশোধের পর ভাগ-বাটোয়ারা হওয়া সম্পদ হিসাবে), যার সিংহভাগ ছিল জমি ও স্থাবর সম্পত্তি। দিরহাম হলো সেকালের রৌপ্যমুদ্রা। ১০ দিরহামে সে–সময় একটি বকরি কিনতে পাওয়া যেত।

তাবেয়ি যুগের ব্যবসায়ী আলেমগণ

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন কাপড়ের পাইকারি ব্যবসায়ী (রেশম ব্যবসায়ী)। তাঁর সততা ও ব্যবসার গল্প রূপকথার মতো। একবার তাঁর পার্টনার কাপড়ের একটি খুঁত ক্রেতার কাছে লুকাতে ভুলে যাওয়ায় তিনি সেই পুরো চালানের বিপুল লভ্যাংশ (হাজারো দিরহাম) দান করে দিয়েছিলেন। প্রখ্যাত তাবেয়ি সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.) ছিলেন মদিনার সাত ফকিহর একজন, যাঁর সম্পদের মধ্যে তেলের ব্যবসা ছিল বলে জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ আছে। ইমাম সুফিয়ান সাওরিও মুহাদ্দিস হওয়ার পাশাপাশি তিনি ব্যবসায়ও যুক্ত ছিলেন। ব্যবসা কেন প্রয়োজন—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেছেন, তাঁর অর্থ হলো, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে শাসকদের ইচ্ছার কাছে আলেমদের নতিস্বীকার করতে হতো। (আবু নুয়াইম আল-ইসফাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া)

ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ও অন্যান্য

ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক তো কিংবদন্তীতুল্য মুহাদ্দিস, সুফি ও যোদ্ধা। পাশাপাশি তিনি ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী এবং তাঁর ব্যবসার লাভ থেকে সমকালীন দরিদ্র আলেমদের (যাঁদের মধ্যে ছিলেন ফুজাই ইবনে ইয়াজের) ভরণপোষণ ও হজের খরচ বহন করতেন। এ ছাড়া মিসরের ইমাম লাইস ইবনে সাদের জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ আছে, তিনি ব্যবসায় থেকে বিপুল সম্পদ আয় করেছিলেন এবং ইমাম মালিকের মাদ্রাসায় তাঁর নিয়মিত অনুদান দিতেন।

ইবনুল জাওজির আহ্বান

হিজরি তৃতীয় শতক থেকে এই ধারা আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে—মুসলিম বিশ্বের আলেম আর পণ্ডিতরা এমন এক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা আন্দালুস থেকে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হিজরি ষষ্ঠ শতকের চিন্তাবিদ ইমাম ইবনুল জাওজি তাঁর সাইদুল খাতির গ্রন্থে আলেমদের অর্থনৈতিক পরাধীনতার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, আলেমদের জন্য স্বাবলম্বী হওয়া এবং কোনো শাসক বা ধনীর অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল না থাকা জ্ঞানের মর্যাদা রক্ষার জন্য অপরিহার্য, কারণ অর্থনৈতিক পরাধীনতা সহজেই আত্মমর্যাদার সঙ্গে সমঝোতায় পরিণত হতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলতেন, “আমি ব্যবসা না করলে এই ধনীদের দাস হয়ে যেতাম।”

বাগদাদের দালাজ সিজিস্তানি

হিজরি চতুর্থ শতকের সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্রগুলোর একজন ছিলেন মুহাদ্দিস দালাজ ইবনে আহমদ আস-সিজিস্তানি (মৃ. ৩৫১ হি.)। তাঁর স্মৃতিশক্তি নিয়ে ইমাম দারাকুতনি বলেছিলেন, তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে দালাজের মতো নির্ভরযোগ্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী আর কাউকে তিনি দেখেননি। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, বৈরুত: মুআসসাসাতুর রিসালা, তৃতীয় প্রকাশ, ১৯৮৫) কিন্তু দালাজ শুধু হাদিসশাস্ত্রে অনন্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর যুগের সবচেয়ে ধনী মানুষদের একজন। বাগদাদের কুতাইআ এলাকায় তাঁর যে বাড়ি ছিল, তার ব্যাপারে তিনি নিজেই বলতেন, পুরো দুনিয়ায় বাগদাদের মতো শহর নেই, বাগদাদে কুতাইআর মতো এলাকা নেই, আর কুতাইআতে তার বাড়ির মতো বাড়ি নেই। মক্কাতেও তিনি বিপুল অর্থ দিয়ে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন লাখ স্বর্ণমুদ্রার সমান। এতটাই বিপুল যে বুয়াইহি শাসক মুইজ্জুদ্দাওলা তাঁর মৃত্যুর পরপরই এই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নেন। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, বৈরুত: মুআসসাসাতুর রিসালা, ১৯৮৫, খণ্ড ১৫)

আন্দালুস থেকে চীন: বিস্ময়কর বাণিজ্য যাত্রা

মুসলিম আলেমদের ব্যবসা আর জ্ঞানার্জনের সীমা কোনো একটা অঞ্চলে আবদ্ধ ছিল না। এর সবচেয়ে চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত স্পেনের ভালেন্সিয়ার মুহাদ্দিস সাদুল খায়ের আল-আনসারি আল-আন্দালুসি (মৃ. ৫৪১ হি.)। তিনি ব্যবসার সূত্রে স্পেন থেকে রওনা দিয়ে উত্তর আফ্রিকা, মিসর, বাগদাদ হয়ে একেবারে চীন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন, আর এ কারণেই তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘আল-সিনি’ বা ‘চীনের লোক’ উপাধি যুক্ত করতেন। বাগদাদে ফিরে তিনি ইমাম গাজালির কাছে পড়াশোনা করেন এবং নিজেও হাদিসের বড় শিক্ষক হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি মার্কো পোলো বা ইবনে বতুতার অনেক আগেই এই দূরপাল্লার যাত্রা সম্পন্ন করেছিলেন। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, বৈরুত: মুআসসাসাতুর রিসালা, ১৯৮৫, খণ্ড ২০) এমন আরও অনেক আলেমের কথা পাওয়া যায়, যাঁরা সমুদ্র-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি দূরদেশের গ্রন্থাগার থেকে বিরল পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতেন বা কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা করতেন মিসর থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত। (আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনুন নাজ্জার, জাইলু তারিখি বাগদাদ, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ২০০৪)

পেশার নাম যখন পরিচয়ের অংশ

ব্যবসায় আলেমদের সততা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে অনেক সময় তাদের পেশাই নামের অংশ হয়ে যেত—‘আল-কাত্তান’ (তুলা ব্যবসায়ী), ‘আল-বাজ্জাজ’ (কাপড় ব্যবসায়ী), ‘আল-জাওহারি’ (জহুরি), ‘আল-ওয়াররাক’ (বই ব্যবসায়ী)। শুধু ফকিহ বা শাস্ত্রীয় আলেমরাই নন, চিকিৎসক ও অন্যান্য বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত পণ্ডিতরাও ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দামেস্কের নুরি হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক জামালুদ্দিন আর-রাহবি (মৃ. ৬৫৮ হি.) দামেস্ক থেকে দুর্লভ ভেষজ সংগ্রহ করে কায়রোতে রপ্তানি করতেন, আর কায়রো থেকে চিকিৎসা-সরঞ্জাম আমদানি করতেন। এই বাণিজ্যিক সফরগুলোই দুই অঞ্চলের চিকিৎসাবিদ্যা বিনিময়ের একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। (ইবনু আবি উসাইবিয়া, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৬৫)

সততার পুরস্কার

এমন একটি সততার গল্প ইতিহাসবিদ জামালুদ্দিন আল-কিফতি লিখে গেছেন। দামেস্কের ব্যাকরণবিদ আলি ইবনে সাইদ ইবনে দাব্বাবা (মৃ. ৫৬০ হি.) কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা করতেন। একবার আইয়ুবি সেনাপতি আসাদুদ্দিন শিরকুহর দরবারে কাপড় বিক্রি করে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখেন, তাঁকে ভুলবশত বাড়তি টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি সেই অতিরিক্ত অর্থ ফিরিয়ে দিতে দরবারে যান এবং এই সততায় মুগ্ধ হয়ে শিরকুহ তাঁকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করেন। (জামালুদ্দিন আল-কিফতি, ইনবাহুর রুওয়াত আলা আনবাহিন নুহাত, কায়রো: দারুল ফিকরিল আরাবি, ১৯৫০)

এই সব গল্প থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামের স্বর্ণযুগে আলেমরা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো দরিদ্র গোষ্ঠী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন বাণিজ্যের সক্রিয় অংশীদার এবং এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই তাঁদের জ্ঞানচর্চাকে শাসকের অনুগ্রহ থেকে মুক্ত রাখতে সহায়ক হয়েছিল।