বৈষম্যের বিরুদ্ধে সভ্যতার নতুন পথ: প্রযুক্তি বনাম ক্ষুধা
বৈষম্যের বিরুদ্ধে সভ্যতার নতুন পথ: প্রযুক্তি বনাম ক্ষুধা

একদিকে মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি স্থাপনের স্বপ্ন, অন্যদিকে বিশ্বের ১৩টি দেশে তীব্র ক্ষুধার সংকট। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রবল। অথচ প্রযুক্তি ও সম্পদের অসম বণ্টন এই বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলছে।

ধনকুবেরদের সম্পদ বনাম বিশ্ব ক্ষুধা

ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ এক সময় ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছিল। এই বিপুল অর্থের পরিমাণ বোঝাতে গিয়ে বলা হয়, একজন মানুষ যদি প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার খরচ করেন, তাহলে এক ট্রিলিয়ন ডলার শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় ২ হাজার ৭৪০ বছর। অথচ অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি সম্পদ মুষ্টিমেয় ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত।

পুঁজিবাদের মরণব্যাধি ও মার্ক্সের বিশ্লেষণ

কার্ল মার্ক্স দেড় শতাব্দী আগে পুঁজিবাদের এই মরণব্যাধি চিহ্নিত করেছিলেন—সম্পদ ক্রমে কেন্দ্রীভূত হয় এবং বৈষম্য পুনরুৎপাদিত হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির গবেষণাও দেখায়, কীভাবে সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে জমা হয়। এই বৈষম্য কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার ফল নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ফল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

শিল্পবিপ্লবের আগেও রাজা-বাদশাহ ও সামন্ত প্রভুদের শাসনে সাধারণ মানুষ শোষিত হতো। শিল্পবিপ্লবের পর পুঁজিপতিরা সম্পদের মালিক হলেও শ্রমিকরা রয়ে গেল গরিবির বৃত্তে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা মাওবাদী চীনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সমতা ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করে। অতীতের ব্যর্থতা বর্তমান বৈষম্যকে বৈধতা দিতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ন্যায্যতার তত্ত্ব ও নৈতিক অগ্রাধিকার

ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরোধী না হলেও মনে করতেন, সম্পত্তি যখন মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়, তখন তা শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। জন রলসের ‘ন্যায্যতার তত্ত্ব’ বলে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা তখনই সফল, যখন তার সুফল সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির কাছেও পৌঁছায়। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের গবেষণা দেখায়, আধুনিক দুর্ভিক্ষ প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।

প্রযুক্তি বনাম মানবিকতা

ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস বা মার্ক জাকারবার্গদের মতো ধনকুবেরদের সম্পদ ত্রুটিপূর্ণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতীক। সভ্যতা কি কেবল মহাকাশ অভিযান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎকর্ষ, নাকি মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা? ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়তো আমাদের সময়কে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বর্ণযুগ’ বলবে, কিন্তু একই সঙ্গে ধিক্কার দেবে—এই যুগে মানুষ মঙ্গল জয়ের স্বপ্ন দেখলেও নিজ গ্রহের অভুক্ত মানুষদের জন্য ভাতের বন্দোবস্ত করতে পারেনি।