ঢাকার দোহার উপজেলায় একটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের চাপে পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে প্রথমে মেয়ে লাভলী আক্তার এবং পরে তার মা রেহানা বেগম মারা যান।
ঘটনার বিবরণ
দোহার উপজেলার খালপাড় এলাকার বাসিন্দা লাভলী আক্তার (৪০) প্রায় এক বছর আগে ‘রুরাল কনস্ট্রাকশন নিউনেশন’ নামক এনজিওর বটিয়া শাখা থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নেন। এই টাকা দিয়ে তিনি তার ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু ছেলে কাজ করে টাকা না পাঠানোয় তিনি কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। এনজিও কর্মকর্তারা তাকে নানাভাবে চাপ দিতে থাকেন এবং গালাগাল করেন।
চাপ সহ্য করতে না পেরে লাভলী বাড়ি ছেড়ে উপজেলার নাগেরকান্দায় তার মা রেহানা বেগমের বাড়িতে চলে যান। সেখানেও এনজিওর এক কর্মকর্তা তাকে ঋণের টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করার ভয় দেখান। ওই দিনই লাভলী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সন্ধ্যার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মায়ের মৃত্যু
লাভলীর মৃত্যুর এক সপ্তাহও না যেতেই এনজিও কর্মকর্তারা ঋণের টাকা আদায়ের জন্য তার মা রেহানা বেগমকে চাপ দিতে শুরু করেন। রেহানা বেগম আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দোহার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা-মেয়ের মৃত্যুতে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পরিবারের অভিযোগ
রেহানা বেগমের ছেলে ও লাভলীর ভাই নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মা ঋণের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তবুও এনজিওর লোকজন বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে এবং পুলিশের ভয় দেখায়। একপর্যায়ে সিঁড়িতে দাঁড়ানো অবস্থায় মা পড়ে গিয়ে মারা যান। এনজিওর চাপ সইতে না পেরে আমার বোন ও মা মারা গেছেন। আমি তাদের মৃত্যুর বিচার চাই।’
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
নাগেরকান্দা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক। এনজিও কর্মকর্তাদের এমন আচরণে ভয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এ বিষয়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এনজিওর বক্তব্য
এ বিষয়ে রুরাল কনস্ট্রাকশন নিউনেশনের বটিয়া শাখার ব্যবস্থাপক আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘ঋণগ্রহীতা লাভলী আক্তার ছয় মাস আগে ঋণখেলাপি হয়েছেন। আমরা টাকা আদায়ে নানাভাবে চেষ্টা করেছি। লাভলী মারা যাওয়ার পর আমরা ঋণ মওকুফের জন্য ডেথ সার্টিফিকেট চাইতে তার মায়ের বাড়িতে যাই। টাকার জন্য মাকে চাপ দেওয়া হয়নি।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবার লিখিতভাবে অভিযোগ জানালে আমরা ওই এনজিওর বিষয়ে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’



