জ্বালানিসংকটে মোটরসাইকেল বিক্রিতে ধস, ঈদ মৌসুমেও চাহিদা কমেছে
ঈদুল ফিতরের মৌসুমে সাধারণত মোটরসাইকেল বিক্রি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন ব্র্যান্ডগুলো বিশেষ ছাড় ও ক্যাশব্যাক সুবিধা প্রদান করে। কিন্তু এবারের ঈদে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি ঈদ উপলক্ষে মোটরসাইকেল বিক্রি ৮ শতাংশ কমেছে, এবং এপ্রিল মাসে এই পতনের হার ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিক্রেতারা দাবি করছেন।
জ্বালানিসংকট ও আমদানি খরচ বৃদ্ধি প্রধান কারণ
গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে যানবাহনের জন্য তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এই সংকটের কারণে মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, বিক্রি কমে যাওয়ার মূল কারণ এই জ্বালানিসংকট। এছাড়া, মোটরসাইকেল আমদানিতে পরিবহন ও এলসির খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিক্রির পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্য পতন
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশে ৫৬,৪৮৬টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। চলতি ২০২৬ সালের মার্চে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫১,৯৫৮টিতে, যা গত বছরের তুলনায় ৪,৫২৮টি বা ৮ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল, কিন্তু এবারে একই সময়ে বিক্রি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৪ হাজারটি। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এই প্রান্তিকে বিক্রি কমেছে ১৩,০০০টি বা ৯.৭ শতাংশ।
ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইয়ামাহার বিজনেস ম্যানেজার হোসেন মোহাম্মদ অপশন জানিয়েছেন, মোটরসাইকেল একটি অপরিহার্য বাহন হওয়ায়, জ্বালানিসংকট কমলে বিক্রি আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে। হিরো ব্র্যান্ডের কোম্পানি সচিব ও সিএফও বিজয় কুমার মণ্ডল উল্লেখ করেছেন, ঢাকার বাইরে রংপুর, যশোর, বগুড়া ও চট্টগ্রাম জেলায় হিরো ব্র্যান্ডের বিক্রি ২-১৫ শতাংশ কমেছে। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, সংকট অব্যাহত থাকলে এপ্রিল মাসে বিক্রি ১০-১৫ শতাংশ কমতে পারে।
সার্ভিসিং সেবা ও ব্যবহারেও ধস
জ্বালানিসংকটের কারণে মোটরসাইকেল বিক্রেতারা ক্রেতাদের জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা আগে স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে তিন লিটার পর্যন্ত দেওয়া হতো। এর ফলে সার্ভিসিং সেবা নিতে আসা মোটরসাইকেলের সংখ্যাও কমেছে। মোটরসাইকেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, সার্ভিসিং সেবার চাহিদা ২০-২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা যন্ত্রাংশ বিক্রিকেও প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ হোন্ডা লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেছেন, সার্ভিসিং সেবা কমে যাওয়া নির্দেশ করে মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমেছে, এবং ক্রেতারা জ্বালানিসংকটের কারণে কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখছেন।
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ: রাজধানীর দৃশ্য
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডগুলোর দোকানে ক্রেতাদের ভিড় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখা গেছে। হিরো ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ বিক্রয়কেন্দ্রে আগে দিনে ১২-১৫টি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, যা এবারের ঈদে ১০টির নিচে নেমে এসেছে। সার্ভিসিং সেবার সংখ্যাও ১৫০টি থেকে কমে ১০০টির নিচে পৌঁছেছে। ইয়ামাহার ফ্ল্যাগশিপ কেন্দ্রে বিক্রি আগে দৈনিক ১৫টি ছিল, যা এখন ৮-১০টিতে সীমিত। বিপণন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান মন্তব্য করেছেন, জ্বালানিসংকট শুরুর দিকে বিক্রি কমলেও বর্তমানে কিছুটা প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী অমিতাভ হালদার উল্লেখ করেছেন, মোটরসাইকেল ছোটখাটো চাকরিজীবীদের জন্য একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহন, এবং জ্বালানিসংকট সত্ত্বেও এর ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে, জ্বালানিসংকট ও অর্থনৈতিক চাপ মোটরসাইকেল শিল্পকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই ধস অব্যাহত থাকতে পারে।



