বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সংকট, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণ শ্রেণিকরণ নীতি এবং কর্মমূলধন সংকট নিরসনে নীতিগত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মঙ্গলবার (১২ মে) বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। সাক্ষাৎ শেষে বিসিআইয়ের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি হস্তান্তর করা হয়, যেখানে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সাত দফা সুপারিশ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সংকট নিরসনের দাবি
চিঠিতে বলা হয়, দেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্তভাবে উন্নত না হওয়ায় শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই অবস্থায় ১২ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ নতুন অর্থায়ন কাঠামো প্রবর্তনের আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে রিফাইন্যান্সিং সুবিধা সম্প্রসারণ এবং অপেক্ষাকৃত কম সুদে অফশোর ফান্ড ব্যবহার করার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগ অংশীদারদের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করার সুপারিশ করা হয়।
কর্মমূলধন ও শ্রেণিকরণ নীতি নিয়ে উদ্বেগ
বিসিআই জানায়, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে উৎপাদন কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকট, গ্যাস সরবরাহ বিঘ্ন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি (২৭৪%), ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি (৯–১৫%), টাকার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে কর্মমূলধন সংকটে ভুগছে। এ অবস্থায় শিল্পখাতের কর্মমূলধন সুবিধা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি এলসি (Letter of Credit) সংশ্লিষ্ট বকেয়া অর্থকে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না হয়ে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারে।
ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিতে সংশোধনের প্রস্তাব
চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলা হয়, বর্তমানে তিন মাসে ঋণ শ্রেণিকরণ করা হয়, যা শিল্পখাতের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ সময়সীমা ছয় মাসে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সুদের হার ও ব্যাংকিং খরচ কমানোর দাবি
বিসিআই অভিযোগ করে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে সুদের হার ১৪–১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা শিল্প খাতের জন্য অত্যন্ত চাপসৃষ্টিকারী। সংগঠনটির মতে, প্রকৃত তহবিল ব্যয় ও ঝুঁকি বিবেচনায় যৌক্তিক সুদের হার ১১–১২ শতাংশ হওয়া উচিত। এছাড়া ব্যাংক চার্জ, কমিশন, পেনাল সুদ এবং সুদ গণনার জটিল পদ্ধতি (কম্পাউন্ড রেট) বাতিল করে সরল সুদ পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানানো হয়। সুদ আদায়ও অর্ধ-বার্ষিক ভিত্তিতে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়।
সিআইবি রিপোর্ট ও গ্রুপভিত্তিক দায় নিয়ে অসন্তোষ
চিঠিতে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) রিপোর্ট ব্যবস্থার কিছু জটিলতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, কোনো গ্রুপের এক কোম্পানি খেলাপি হলে পুরো গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়, যা ন্যায্য নয়। বিসিআই পৃথক কোম্পানিকে পৃথক সত্তা হিসেবে বিবেচনার দাবি জানিয়ে বলে, এতে ভালো পারফর্ম করা প্রতিষ্ঠানগুলো অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (সিএমএসই) অর্থায়ন সহজ করার আহ্বান
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থায়ন সম্প্রসারণ এবং জেলা বা ক্লাস্টারভিত্তিক পাইলট প্রকল্প চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জটিলতা কমিয়ে ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
শিল্পবান্ধব নীতি সংস্কারের প্রত্যাশা
বিসিআই নেতারা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উৎপাদন খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাংকিং নীতি আরও নমনীয়, বাস্তবভিত্তিক এবং শিল্পবান্ধব করা জরুরি। না হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।



