এনবিআর বিভাজন অসম্পূর্ণ সংস্কার: অর্থমন্ত্রী
এনবিআর বিভাজন অসম্পূর্ণ সংস্কার: অর্থমন্ত্রী

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদা করার উদ্যোগকে 'হাফ-বেকড' বা অসম্পূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, কোনো সংস্কার না থাকার চেয়ে অসম্পূর্ণ সংস্কার বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে রেমিট্যান্স ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে এবং দুই বছরে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যের কথাও জানান তিনি। সোমবার (১১ মে) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত 'সোনার বাংলা নীতি আলোচনা ২০২৬' শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

এনবিআর বিভাজন ও করনীতি

এনবিআর বিভাজন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআরকে দুই ভাগ করা এখন সময়ের দাবি। তবে করনীতি কারা প্রণয়ন করবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। সরকার করনীতি আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের মধ্যে রাখতে চায় না। শুধু আমলারা নীতি নির্ধারণ করলে বড় সংস্কারের কোনো অর্থ থাকবে না। তিনি জানান, অসম্পূর্ণ সংস্কারসংক্রান্ত বিলটি বর্তমানে সংসদে আটকে রয়েছে এবং এটি আরও উন্নত করতে একটি কমিটি কাজ করছে।

সরকারি প্রকল্প ও দুর্নীতি

সরকারি প্রকল্প বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে চলমান প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাই করা হচ্ছে। অনেক প্রকল্প দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থে নেওয়া হয়েছিল, যা মানুষের কোনো কাজে আসবে না। এখন থেকে শুধু জনকল্যাণমূলক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্প চালু রাখা হবে। নতুন প্রকল্প অনুমোদনে অর্থের সঠিক মূল্য, বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। দুর্নীতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে সরাসরি যোগাযোগনির্ভর ব্যবস্থার কারণে ঘুষ দিতে হয়। যাঁরা ব্যবসা সহজীকরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তাদের অপ্রয়োজনীয় করে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, চুরির আশঙ্কায় নীতিনির্ধারণ থামিয়ে রাখা যাবে না। চুরি ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পুঁজিবাজার

আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আইএমএফের কিছু শর্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, সব শর্ত দেশের অর্থনীতির জন্য উপযোগী নয় এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। সেখানে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হবে না এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পেশাদার লোক নিয়োগ দেওয়া হবে।

জ্বালানি খাত

জ্বালানি খাতের গুরুতর পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায় বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত চার বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় নেপাল থেকে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চলতি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছে সরকার। মহেশখালীতে বড় আকারের গ্যাস মজুত ও আমদানির পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য কমপক্ষে তিন মাসের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা।

রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ

রপ্তানি খাত বৈচিত্র্যময় করার প্রত্যয় জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প যেসব বন্ড ও শুল্কসুবিধা পায়, ইলেকট্রনিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও গোল্ড জুয়েলারির মতো সম্ভাবনাময় খাতকেও একই সুবিধা দেওয়া হবে। ডায়মন্ড কাটিং ও গোল্ড জুয়েলারি রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতামত

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরাও গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেন, এই মুহূর্তে কর ও শুল্ক বাড়ানো হলে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নীতিনির্ধারকেরা যেভাবে চিন্তা করেন বাস্তবায়নটা সেভাবে হয় না এবং সংস্কারের পথ এক জায়গায় গিয়ে আটকে যায়। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ব্যবসা সহজীকরণের বদলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে। ইউসিবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরিফ জহির বলেন, নতুন শিল্পের জন্য গ্যাসের উচ্চমূল্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আনোয়ার উল আলম বলেন, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দূর করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহতেশামুল হক বলেন, বাজেট ও করকাঠামো নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদেরা বক্তব্য দেন।