যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সমালোচনার জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তিটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এতে বাংলাদেশের ওপরই বেশি শর্ত আরোপ হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনাকে স্বাগত জানালেও সমালোচনা করার আগে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের চুক্তিগুলো দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁর এমন পরামর্শ আসে।

চুক্তির শর্ত ও তুলনা

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (এআরটি) সই করে বাংলাদেশ। বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে এই চুক্তির আলোচনায় ভূমিকা রেখেছিলেন। এই চুক্তিতে বাংলাদশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পালনীয় মাত্র ছয়টি শর্তের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য ১৩১টি শর্ত রয়েছে।

এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ১৩১টাতে “শ্যাল” বলেছে না? আমরা তো একা এই চুক্তি করিনি, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো করেছে। ইন্দোনেশিয়া ২৩১টাতে এই রকম “শ্যাল” বলেছে। সুতরাং বাংলাদেশের চুক্তিটি যখন পাঠ করবেন, তখন ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, অন্যান্য যারা চুক্তি করেছে, তাদেরটা পাশে নিয়ে পাঠ করলে পরে আপনি জিনিসটা ভালো করে বুঝবেন।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুক্ত আলোচনার আহ্বান

চুক্তি নিয়ে আলোচনাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে আলোচনা হওয়া খুব ভালো এবং মুক্ত আলোচনা হওয়াই উচিত, যেকোনো চুক্তিরই...আমি বলব, আপনারা সবাই মিলে সেটি দেখেন। তূলনামূলক দেখেন, আমরা কী পেয়েছি, কী পাইনি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চুক্তি নিয়ে করা আরেক প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ‘এই আলোচনাটা ওইভাবে হওয়া উচিত, কারণ যুক্তরাষ্ট্র সব দেশকে বলেছে যে, তোমাদেরকে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ, যেমন আমাদের ৩৯% বা ৩৭%। অন্যান্য সব দেশকে দিয়েছে, নেগোশিয়েট করেছে, কেউ ২০ পেয়েছে, ভিয়েতনাম। আমরা ১৯ পেয়েছি। এখন কে কী, সবারই কিন্তু এই অ্যাগ্রিমেন্টগুলো পাবলিক স্পেসে পাওয়া যাচ্ছে।‘আপনারা বাংলাদেশের অ্যাগ্রিমেন্ট অন্যান্য দেশের অ্যাগ্রিমেন্টের সঙ্গে তুলনা করে পড়েন, তাহলে বুঝবেন আমরা কী রেট পেয়েছি; পলিসিতে আমরা কী কী বিষয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি, অন্যরাও কী চুক্তি করেছে, অন্যদের ‘পারচেজ কমিটমেন্ট’ কত, আমাদের ‘পারচেজ কমিটমেন্ট’ কত, সব মিলিয়ে দেখেন।’

চীন সফর ও তিস্তা চুক্তি

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মঙ্গলবার বিকেলে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যান। যাওয়ার আগে দুপুরে চীন সফরের উদ্দেশ্য, ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘চীন আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বন্ধু দেশ, যার সঙ্গে আমাদের ‘স্ট্রাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে আমাদের সম্পর্ক। এবং আমাদের নতুন সরকারের তরফ থেকে এটা হচ্ছে চীনে প্রথম সফর। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এই সফরে আমরা আমাদের দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দ্রুত এবং আরও গভীর এবং ব্যাপ্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।’

চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কোনো আলোচনা হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ‘অবশ্যই আলোচনা হবে। এটা আমাদের ওই অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়। তারা ডাক দিয়েছে “জাগো বাহে”। সেই ডাকে যদি আমরা সাড়া না দিই, তাহলে আমরা পড়ে আছি কেন? এটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার, সেই অঞ্চলের সমস্যা সুরাহা করার এবং এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার আমরা পূরণ করব এবং চীন সফরে এই বিষয়টা আমরা নিশ্চয়ই আলোচনা করব।’

ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি

ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে প্রায় দেড় দশক ধরে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে চুক্তিটি করা যাচ্ছে না বলে ভারতের কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে আসছে। এবারের বিধানসভার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় হয়েছে।

এতে তিস্তা চুক্তির সুরাহা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে এখনো সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং তারা কী ভাবছে, কী করবে, সেটা তারা যদি না জানায়, তাদের মাইন্ড রিড করার কাজ আমার না। তবে প্রত্যাশা থাকবে, যাতে করে এই চুক্তিটা যেটা হয়েছিল তখন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা কনসিডার করতে পারি কি না। কিন্তু সে জন্য তো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে।’

বাংলাদেশের স্বার্থ সর্বাগ্রে

চীনের প্রকল্প এবং ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি দুটি ভিন্ন বিষয়কে এক করে দেখা প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা যেটা হচ্ছে, তিস্তাপারের মানুষের একটা বড় ধরনের ‘ইকোলজিক্যাল’ বিপর্যয়ের মধ্যে তারা আছে, এটা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। আমরা যেভাবে পারি, যে কয়টা উপায় আছে, সবগুলো উপায় আমরা অনুসন্ধান করব। যেটা সর্বোত্তম, সেটাই আমরা দেব। এখানে সবচেয়ে বড় বিচার্য বিষয় হচ্ছে, আমাদের মানুষের ইন্টারেস্ট, বাংলাদেশ ফার্স্ট।’

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বাংলাদেশ বিদ্বেষী বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরে সাংবাদিকেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, এখন আসামের পর পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশে ‘পুশ–ইন’ বাড়বে বলে মনে করেন কি না?

জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ‘যখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী এ কথাটি বলেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তিনি কিছু কাজ করেছেন, আপনারা দেখেছেন আমরা সেটাকে কড়া প্রতিবাদ দিয়েছি। সে বিষয়ে আমাদের যা যা ব্যবস্থা আমরা নেব।’