যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের ওপর একতরফা বাধ্যবাধকতা
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: একতরফা বাধ্যবাধকতা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কিছুই করতে হবে না। কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকলে সেটা হবে ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে এই চুক্তি বাতিল চেয়েছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকেও চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে। অর্থনীতিবিদেরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মূল চুক্তির ধারাসমূহ

মূল চুক্তিতে ৬টি ধারা রয়েছে। তবে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার উল্লেখ রয়েছে পরিশিষ্টে। পরিশিষ্টে দেওয়া সব সংযুক্তি চুক্তিরই অংশ।

প্রথম ধারা: শুল্ক ও কোটা

এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক বসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোটা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অশুল্ক বাধা

অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ধারায় ১১টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মূল কথা হলো মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও এমন কোনো নিয়ম, কাগজপত্র, অনুমতি, পরীক্ষা, মান যাচাই বা লাইসেন্স আরোপের মতো নিয়ম করা যাবে না, যা বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেমন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি লাইসেন্স প্রয়োগ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান মেনে চলে, সেসব পণ্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে এবং সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে সনদ দেওয়া থাকলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করবে না।

কৃষিপণ্য

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা আছে। তবে স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক হতে হবে, শুধু বাণিজ্য ঠেকানোর জন্য নিয়ম করা যাবে না। বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড নেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। জিআই সুরক্ষা বা স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

মেধাস্বত্ব

বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের শক্ত সুরক্ষা দেবে। মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন ঠেকাতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সীমান্ত পর্যায়ে ব্যবস্থা নেবে, অনলাইন ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

সেবা খাত

সেবা খাত নিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন নিয়ম করতে পারবে না, যাতে মার্কিন সেবাপ্রতিষ্ঠান দেশীয় বা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম সুবিধা পায়। বাণিজ্য-সংক্রান্ত নতুন নিয়ম করার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং আলোচনা ছাড়া হঠাৎ কোনো বিধি চাপানো যাবে না।

শ্রম ও পরিবেশ

এর পরের অনুচ্ছেদ শ্রম নিয়ে। এখানে বলা হয়েছে যে জোরপূর্বক বানানো কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে শিশুশ্রম, চুক্তিবদ্ধ বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম। পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ ও বজায় রাখার কথা আছে এরপরেই।

সীমান্ত ও কর

পরের অনুচ্ছেদটি সীমান্তব্যবস্থা ও কর বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম নেয়, বাংলাদেশ সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয় বা কর ফেরত দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে না, এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাতেও নয়। বাংলাদেশ এমন ভ্যাট বসাবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির প্রতি বৈষম্য হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যছাড়ের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি

চুক্তির এই ধারায় অনুচ্ছেদ রয়েছে চারটি। এতে প্রথমেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করবে। মার্কিন ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কোনো নীতি নেবে না। ব্যবসার প্রয়োজনে নিরাপদে সীমান্ত পেরোনো ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করবে এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি

বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাহলে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করবে। এরপরও যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর না হয়, তাহলে তারা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার চালু করতে পারবে।

শুল্ক ও তথ্য

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকভাবে পাঠানো কনটেন্ট বা তথ্যের ওপর শুল্ক বসাবে না। অনলাইন লেনদেনে স্থায়ীভাবে শুল্ক না রাখার ডব্লিউটিও প্রস্তাবও সমর্থন করবে।

বাজারে প্রবেশের শর্ত

পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাজারে প্রবেশের শর্ত। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, সোর্স কোড বা গোপন ব্যবসায়িক তথ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। নির্দিষ্ট প্রযুক্তি কিনতে বা ব্যবহার করতেও বাধ্য করা যাবে না। তবে সরকারি কেনাকাটা, দুই পক্ষের বাণিজ্যিক চুক্তি, তদন্ত, আইন প্রয়োগ বা আদালতের প্রয়োজনে সোর্স কোড বা অ্যালগরিদম চাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা

চুক্তির ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে জানাবে। আলোচনার পর বাংলাদেশ নিজের আইন মেনে একই ধরনের সহায়ক ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথ্য দেবে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি

পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে। এ জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মানবে, নিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য করবে এবং কোনো কোম্পানি যেন এসব নিয়ম ফাঁকি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে।

সহযোগিতা ও নিষেধাজ্ঞা

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ করতে পারে—এমন লেনদেন ঠেকানো যায়। আবার বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, যাতে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়ে। বাংলাদেশের এই সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ যাচাই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিবেচনা করবে।

অন্যান্য ব্যবস্থা

সংক্রান্ত পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজ করতে কাজ করবে। বাংলাদেশ বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চলাচল উৎসাহিত করবে। দুই দেশ শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে সহযোগিতা চুক্তিও করবে। বাংলাদেশ যদি কোনো অ-বাজার অর্থনীতির দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি দুর্বল হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করবে। তাতেও উদ্বেগ দূর না হলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আগের পারস্পরিক শুল্ক আবার বসাতে পারবে।

পারমাণবিক প্রযুক্তি

এই অনুচ্ছেদের সবশেষে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ে। তবে বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে বা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে বিদ্যমান চুল্লির জন্য চুক্তি হয়ে থাকলে সেসব প্রযুক্তি বা উপকরণ কেনা যাবে।

বাণিজ্যিক বিবেচনা ও সুযোগ

এই ধারায় আছে চারটি অনুচ্ছেদ। বিনিয়োগ–সংক্রান্ত প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগ সহজ করবে। মার্কিন বিনিয়োগকারীরা দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের চেয়ে কম সুবিধা পাবেন না। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক) ও ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) এসব খাতে অর্থায়ন করতে পারে। বাংলাদেশ এমন নতুন বিনিয়োগেও সহযোগিতা করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান তৈরি করে।

বাণিজ্যিক বিবেচনা

পরের অনুচ্ছেদের বিষয় বাণিজ্যিক বিবেচনা। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা কেনাবেচায় বাজারভিত্তিক নিয়ম মেনে চলবে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বা সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে পারবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে অ-বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ছাড়া দেশীয় উৎপাদকদের ভর্তুকি দিতে পারবে না এবং পণ্য উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।

বস্ত্র ও পোশাক

পরের অনুচ্ছেদ বস্ত্র ও পোশাক নিয়ে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য শূন্য বা কম শুল্কে মার্কিন বাজারে ঢুকতে পারে। তবে সুবিধাটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত মিলবে। সেই পরিমাণ নির্ভর করবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতটা তুলা, কৃত্রিম তন্তু বা বস্ত্র উপকরণ আমদানি করছে, তার ওপর।

বাস্তবায়ন, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধান

এই ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে, সংযুক্তি, পরিশিষ্ট ও ফুটনোট—সবই এই চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দুই পক্ষ লিখিতভাবে রাজি হলে চুক্তি বদলানো যাবে, তবে আগের সুবিধা নষ্ট করা যাবে না। এই চুক্তির সুবিধা মূলত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য। তৃতীয় কোনো দেশ বেশি সুবিধা পেলে দুই পক্ষ আলোচনা করে সুবিধাভোগীদের বিষয়ে আলাদা নিয়ম করতে পারবে।

চুক্তি থাকলেও অন্যায্য বাণিজ্য, হঠাৎ আমদানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে অতিরিক্ত শুল্ক বসানো যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তি মানেনি, তাহলে আগে আলোচনা করবে। সমাধান না হলে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী আগের পারস্পরিক শুল্কহার আবার বসাতে পারবে।

যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। নোটিশের ৬০ দিন পর বা দুই পক্ষের ঠিক করা তারিখে বাতিল কার্যকর হবে। দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা লিখিতভাবে জানালে ৬০ দিন পর চুক্তি চালু হবে। চাইলে তারা অন্য তারিখও ঠিক করতে পারবে।

পরিশিষ্ট

প্রথমেই আছে বাংলাদেশের শুল্ক তালিকা। এই অংশে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যে কী হারে শুল্ক নেবে, তা বলা হয়েছে। এতে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত আছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বাংলাদেশ নির্ধারিত নিয়মে শুল্ক কমাবে বা নেবে। এ জন্য পাঁচ ধরনের শ্রেণি রাখা হয়েছে। যেমন ইআইএফ শ্রেণিতে চুক্তি চালুর দিন থেকেই শুল্ক শূন্য হবে। বি-৫ শ্রেণিতে প্রথমে অর্ধেক শুল্ক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে পঞ্চম বছরে শূন্য হবে। বি-১০ শ্রেণিতে প্রথমে অর্ধেক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে দশম বছরে শূন্য হবে। এ শ্রেণিতে শুল্ক আগেই শূন্য, তাই তা শূন্যই থাকবে। এক্স শ্রেণিতে কোনো ছাড় নেই, আগের এমএফএন শুল্কহারই বহাল থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকা অংশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তালিকা অনুযায়ী ঠিক হবে, কোন বাংলাদেশি পণ্য ছাড় পাবে। তালিকাভুক্ত কিছু পণ্যে অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক বসবে না। তালিকার বাইরে থাকা বাংলাদেশি পণ্যে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসতে পারে। তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ এমএফএন শুল্ক আলাদাভাবে বহাল থাকবে।

নির্দিষ্ট অঙ্গীকার

এখানে মূলত চুক্তি কার্যকর করতে দুই দেশ কী কী অঙ্গীকার করছে এবং তা কীভাবে পালন করা হবে, তার উল্লেখ রয়েছে। এর প্রথমটি অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে।

চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ

বাংলাদেশ চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএর অনুমোদনকে গুরুত্ব দেবে। এফডিএ অনুমোদিত চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধকে বাজারজাতের যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে।

মোটরযান ও যন্ত্রাংশ

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নির্গমন মান মেনে তৈরি গাড়ি ও যন্ত্রাংশ গ্রহণ করবে। এসব পণ্য আমদানিতে বাড়তি অনুমোদন বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়া চাইবে না।

কৃষিপণ্য

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের স্বাস্থ্য, মান ও কারিগরি নিয়মকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেবে। মার্কিন সরকারি সনদও গ্রহণ করবে।

শ্রম আইন

বাংলাদেশকে শ্রম আইন সংশোধন করে সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে ইউনিয়ন নিবন্ধনের ২০ শতাংশ সদস্যের শর্ত কমানো, ইউনিয়ন বাতিলে শ্রম আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা এবং সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্যের চাহিদা সীমিত রাখার কথা আছে।

পরিবেশ ও বন

বাংলাদেশের আইন ও নীতিতে উচ্চমানের পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। অবৈধ বনজ পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে হবে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।

সব মিলিয়ে, এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা তুলনামূলকভাবে কম। চুক্তিটি এখনো কার্যকর না হলেও এর প্রভাব নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে।