হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় ইরানে পণ্য পরিবহনের জন্য ছয়টি স্থল ট্রানজিট রুট চালু করেছে পাকিস্তান। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সড়ক করিডর চালু হলো বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
নতুন নির্দেশনা ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৫ এপ্রিল ‘ট্রানজিট অব গুডস থ্রু টেরিটরি অব পাকিস্তান অর্ডার ২০২৬’ জারি করে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, তৃতীয় দেশের পণ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে সড়কপথে ইরানে পাঠানো যাবে। এই সিদ্ধান্তের সময়ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদ সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চলমান সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও এ পদক্ষেপ দেখা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান বলেন, এ উদ্যোগ আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে এবং পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান তেহরানকে এ সুবিধা দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যে চাপ বজায় রাখতে চাইছে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ সেই কৌশলকে দুর্বল করতে পারে কি না—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় পণ্যে নিষেধাজ্ঞা বহাল
নতুন এই ট্রানজিট সুবিধা ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান বিমানযুদ্ধের পর জারি করা নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। ফলে ভারতের কোনো পণ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে পরিবহন করা যাবে না।
ছয় রুটে যুক্ত হলো বন্দর ও সীমান্ত
নির্ধারিত ছয়টি রুট পাকিস্তানের করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদার বন্দরকে ইরানের গাবদ ও তাফতান সীমান্ত ক্রসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এসব রুট বেলুচিস্তানের তুরবাত, পানজগুর, খুজদার, কোয়েটা ও দালবন্দিন হয়ে গেছে। সবচেয়ে ছোট গোয়াদার-গাবদ করিডরে যাতায়াত সময় মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লাগতে পারে। যেখানে করাচি থেকে ইরান সীমান্তে যেতে সময় লাগে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। এতে পরিবহন ব্যয় ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
করাচি বন্দরে চাপ
বর্তমানে ৩ হাজারের বেশি কনটেইনার করাচি বন্দরে আটকে রয়েছে। যুদ্ধঝুঁকি বীমার খরচও বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডর শুধু বাণিজ্য নয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান এখন পশ্চিমমুখী বাণিজ্যে নতুন বিকল্প তৈরি করছে। বিশ্লেষক ইফতিখার ফিরদৌস বলেন, এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন, যার ফলে পাকিস্তান আফগানিস্তানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি পশ্চিমমুখী বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের নতুন স্থল করিডর শুধু অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়; এটি দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য ও কৌশলগত মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে।



