চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় দেশি তিন প্রতিষ্ঠানের জোটের প্রস্তাব
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় দেশি জোটের প্রস্তাব

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও দেশি এমজিএইচ গ্রুপের পর এবার প্রস্তাব দিয়েছে দেশি তিন প্রতিষ্ঠানের একটি জোট। জোটটির নাম 'সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম'। তারা গত ২৮ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটি পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এক মাসের বেশি সময় পর বিষয়টি জানা গেছে।

জোটের সদস্য ও তাদের মালিকানা

জোটের নেতৃত্বে রয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড, যা বর্তমানে চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা করছে। অন্য দুই অংশীদার হলো কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড। তিনটি প্রতিষ্ঠানই দুই থেকে সাড়ে তিন দশক ধরে বন্দরে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোয় নিয়োজিত।

কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান হলেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সরকার দলের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। অন্যদিকে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রস্তাবের মূল বিষয়

নতুন জোটের প্রস্তাব অনুযায়ী, বন্দরের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখেই ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনা করবে কনসোর্টিয়াম। পরিচালনা, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও দৈনন্দিন ব্যয় নিজেদের অর্থে বহন করবে তারা। তবে জাহাজ ও কনটেইনার–সংক্রান্ত সব ধরনের মাশুল আদায় করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর বিনিময়ে প্রতি একক কনটেইনারে ৬৯ ডলার পরিচালন মাশুল চেয়েছে কনসোর্টিয়াম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তাদের প্রস্তাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনার থেকে বন্দরের আয় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার, ব্যয় ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার এবং নিট আয় ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার। কনসোর্টিয়ামের দাবি, তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কোনো অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই বন্দর প্রতি একক কনটেইনারে ৯২ ডলার রাজস্ব ধরে রাখতে পারবে। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছর জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল ব্যয়ের দায়ও বহন করতে হবে না।

ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এমজিএইচের প্রস্তাবের সঙ্গে পার্থক্য

ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব পিপিপি ও জি-টু-জি কাঠামোর আওতায় ১৫ বছরের জন্য পুরো টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার। এ ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। বিনিময়ে বন্দর নির্ধারিত রাজস্ব পাবে। এমজিএইচ গ্রুপও একই ধরনের পিপিপি কাঠামোয় প্রস্তাব দিয়েছে, প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় পাঁচ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তারা।

অন্যদিকে নতুন কনসোর্টিয়ামের মডেল ভিন্ন। তারা টার্মিনাল ইজারা নয়, পরিচালন সেবা দিতে চায়। তাদের প্রস্তাবে টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা পুরোপুরি বন্দরের কাছেই থাকবে। কনসোর্টিয়াম শুধু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। প্রস্তাবিত ১৫ বছর মেয়াদে এই সেবার বিনিময়ে বন্দর থেকে কনটেইনারপ্রতি অর্থ আদায় করবে তারা।

জোটের অংশীদারদের বক্তব্য

সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন বলেন, জোটের তিন প্রতিষ্ঠানেরই বন্দরে দুই থেকে সাড়ে তিন দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দেশি অপারেটরদের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই টার্মিনালে ১৭ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো সম্ভব।

কসমস এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা অংশীদার হাসিন বিন আশরাফ, যিনি সরকার দলের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিনের সন্তান, তিনিও প্রস্তাবে সই করেছেন। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন বলেন, বন্দরের বিদ্যমান বিধিবিধান ও সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী চালু টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং দেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন জোট এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তাঁর মতে, এনসিটি খুবই স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থানের কারণে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে দেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ

নতুন প্রস্তাব জমা পড়লেও আপাতত তা বিবেচনার পর্যায়ে আসেনি। কারণ, এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের আলোচনা এখনো চলমান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দর–কষাকষির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনা কমিটির সদস্যদের বিভিন্ন আপত্তির কারণে গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়। বর্তমানে নতুন করে মূল্যায়ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষির প্রক্রিয়া আবার শুরু হচ্ছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকায় নতুন প্রস্তাবগুলো এখনই বিবেচনার সুযোগ নেই। তবে আলোচনা সফল না হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। তখন দেশি-বিদেশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।