২০ হাজার কোটি টাকার পুনর্বাসন তহবিল গঠন করল বাংলাদেশ ব্যাংক
২০ হাজার কোটি টাকার পুনর্বাসন তহবিল বাংলাদেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকরী মূলধনের সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনর্বাসন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারে এ তথ্য জানানো হয়।

পুনর্বাসন তহবিলের উদ্দেশ্য

দেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কার্যকরী মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বা সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো স্বল্প সুদে অর্থায়নের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত 'বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনর্বাসন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম'-এর আওতায় তিন বছরের জন্য একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠন করা হবে। তহবিলের আকার ২০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যবহার করে বন্ধ বা আংশিকভাবে চালু শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরী মূলধন সরবরাহ করা হবে, যাতে তারা পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

কার্যকরী মূলধন সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে অনেক সংস্থার জন্য কার্যকরী মূলধন সংকট সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নগদ অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকদের বেতন দিতে পারে না, কাঁচামাল কিনতে পারে না এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে উৎপাদন কমে যায়, কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কারখানার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সক্ষমতা অক্ষত থাকলেও শুধু অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। ফলে অস্থায়ী তারল্য সংকট দীর্ঘমেয়াদী শিল্প ও কর্মসংস্থান সংকটে রূপ নিচ্ছে। এই নতুন তহবিল সেই সংকট সমাধানের একটি লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঋণ সুবিধা ও শর্তাবলী

এই স্কিমের আওতায় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান, কার্যকরী মূলধনের অভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় শিল্পনীতির আওতাভুক্ত সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ সুবিধা পাবে। তবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান, ডিমড এক্সপোর্টার এবং বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা ইজারার মাধ্যমে পুনরায় চালু করতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আরও শক্তিশালী করতে চায়।

ঋণের শর্তাবলী

  • এই তহবিল থেকে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ দেবে।
  • একজন ঋণগ্রহীতা বা একটি গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। তবে ব্যবসায়িক অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে তা নবায়ন করা হবে।
  • ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে, যাতে ঋণ নেওয়ার পরপরই কিস্তি পরিশোধের চাপ না থাকে।

ঋণের ব্যবহার

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে এই অর্থ শুধুমাত্র উৎপাদন ও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যবহার করা যাবে। ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ চার মাসের শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রদান, কাঁচামাল ক্রয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, রপ্তানি অর্ডার বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য উৎপাদন-সম্পর্কিত খরচে ব্যবহার করা যাবে। তবে এই অর্থ কোনো বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, পুনঃতফসিল বা সমন্বয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। একইসঙ্গে খেলাপি প্রতিষ্ঠান বা সিআইবি তালিকাভুক্ত গ্রাহকরা এই সুবিধা থেকে বাদ পড়বেন।

শ্রমিকদের অগ্রাধিকার

এই স্কিমের একটি বৈশিষ্ট্য হলো শ্রমিকদের বেতন প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়া। ঋণের অর্থ থেকে সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। নগদে পরিশোধের কোনো সুযোগ থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, এতে বন্ধ বা সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা তাৎক্ষণিকভাবে উপকৃত হবেন এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

তদারকি ব্যবস্থা

পূর্ববর্তী বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই স্কিমে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধের কারণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এছাড়া এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সংস্থার মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতার সনদ নিতে হবে। ঋণের তহবিলের ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এসক্রো বা বিশেষ রাজস্ব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত বিক্রয় প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি পরিদর্শন করতে পারবে। অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।