আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। একদিকে যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে নগদ প্রণোদনার বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বহুল আলোচিত সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স), মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার চিন্তা করছে সরকার। একইসঙ্গে রফতানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য সামনে রেখে নন-আরএমজি খাতের জন্যও বেশ কিছু নতুন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসা সহজীকরণের ভারসাম্য
অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাওয়া বাজেটে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হতে পারে—এমন প্রস্তাবগুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
রেমিট্যান্স বাড়াতে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয়। রফতানি আয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় পরিশোধ, গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে আরও উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনার বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটির কাছাকাছি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে হুন্ডি বা অবৈধ অর্থপাচার চ্যানেলকে। অনেক প্রবাসী এখনও দ্রুত অর্থ পৌঁছানো এবং তুলনামূলক বেশি বিনিময় হার পাওয়ার কারণে অবৈধ পথ ব্যবহার করছেন। এছাড়া ব্যাংকিং জটিলতা, উচ্চ ট্রান্সফার খরচ, বিদেশে কর্মীদের নিরাপত্তা, বিমানবন্দরে হয়রানি এবং দক্ষ কর্মীর ঘাটতিও বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাজেটে অন্যান্য পদক্ষেপ
বাজেটে তাই শুধু নগদ প্রণোদনা বাড়ানো নয়, জেলা পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ডিজিটাল রেমিট্যান্স প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ সহজ করা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপও থাকতে পারে।
দক্ষ কর্মী রফতানিতে জোর
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে দক্ষ জনশক্তি তৈরি। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিক নিম্ন দক্ষতার হওয়ায় তারা কম মজুরির কাজে নিয়োজিত থাকেন। অথচ স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, মেশিন অপারেশন ও কারিগরি পেশায় দক্ষ কর্মীদের বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
এ কারণে সরকার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, গ্রিস, পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা আসতে পারে।
সম্পদ কর থেকে সরে আসার সম্ভাবনা
কয়েক মাস ধরে সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। এনবিআর পরিকল্পনা করেছিল নির্দিষ্ট সীমার ওপরে সম্পদের ওপর সরাসরি কর আরোপের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের কর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারতো।
তবে শেষ মুহূর্তে সরকার এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, বাস্তবায়ন জটিলতা এবং সম্ভাব্য জনঅসন্তোষ বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। বর্তমানে তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের আয়করের ওপর সারচার্জ দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে নতুন সম্পদ কর চালু হলে দ্বৈত করের প্রশ্নও সামনে আসে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সম্পদ কর বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে অন্যদের মতে, দেশে সম্পদ গোপনের প্রবণতা বেশি হওয়ায় এতে সৎ করদাতারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালোটাকা সাদা করার পরিকল্পনাও অনিশ্চিত
আসন্ন বাজেটে আবাসন ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার আলোচনা ছিল। এমনকি অর্থের উৎস নিয়ে কোনও সরকারি সংস্থা প্রশ্ন করতে পারবে না—এ ধরনের দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় ছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজ এবং দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, এ ধরনের ব্যবস্থা দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দিতে পারে এবং সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে। ফলে সরকার শেষ পর্যন্ত এ পরিকল্পনা থেকেও সরে আসতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর নতুন কর বাতিলের পথে
এনবিআর মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু প্রস্তাবটি প্রকাশ হওয়ার পর বাইকার, রাইডশেয়ার চালক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজধানীতে এনবিআর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়।
এ পরিস্থিতিতে সরকার পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সব মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপের পরিবর্তে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেলের ওপর এককালীন কর আরোপের বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করা হচ্ছে। একইভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপরও প্রস্তাবিত কর বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নন-আরএমজি রফতানিতে নতুন সুবিধা
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে রফতানি বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী বাজেটে চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, টেরি টাওয়েলসহ বিভিন্ন নন-আরএমজি খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি ডিক্লারেশন (ইউডি) নিতে রফতানিকারকদের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অফিসে যেতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে ইউডি ইস্যুর ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে। এতে উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে। এছাড়া নন-আরএমজি খাতের উদ্যোক্তাদেরও তৈরি পোশাক খাতের মতো ‘ফ্রি অব কস্ট’ ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
বাজেটের মূল বার্তা কী
সামগ্রিকভাবে আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার একদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর নতুন পথ খুঁজছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। ফলে সম্পদ কর, মোটরসাইকেল কর কিংবা কালোটাকা সাদা করার মতো বিতর্কিত প্রস্তাবগুলো থেকে সরে এসে রেমিট্যান্স, দক্ষ জনশক্তি রফতানি এবং নন-আরএমজি রফতানি খাতকে উৎসাহ দেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে হলে নতুন কর আরোপের চেয়ে করের আওতা বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কর ফাঁকি রোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু কর বাড়ানো নয়, বরং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই রাজস্ব প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি করতে হবে।



