সরকার প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদি বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (BGIS) ইস্যু করে ৫,৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। তবে এই সুকুকে ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
দশ গুণ বেশি দরপত্র
সরকারের আহ্বানকৃত অর্থের বিপরীতে প্রায় ৫৬,৬০৭ কোটি টাকার দরপত্র জমা পড়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০ গুণেরও বেশি। ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানো এবং নিরাপদ শরিয়াহ-সম্মত বিনিয়োগের বিকল্প সীমিত থাকায় ইসলামি ব্যাংকগুলো সুকুকে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রথম স্বল্পমেয়াদি ইজারা সুকুক
রোববার (২৮ জুন) বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ২৭৩ দিনের ইজারা সুকুকের নিলাম আয়োজন করে। এই সুকুকের বার্ষিক খাজনা (রিটার্ন) হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯.৩৬%। বিপুল চাহিদার মধ্যে সরকার ৫,৫০০ কোটি টাকার আবেদন গ্রহণ করেছে। এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর অর্থায়নে ব্যয় করা হবে।
আল-আরাফাহ ইসলামি ব্যাংকের বিশাল আবেদন
নিলামে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে আল-আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক একাই ৪,৪০০ কোটি টাকার আবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ব্যাংকটি মাত্র ৪৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “প্রচলিত ব্যাংকগুলো সহজেই সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে, কিন্তু ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য শরিয়াহ-সম্মত সরকারি বিনিয়োগের পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে সুকুক তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।”
ব্যক্তিগত পর্যায়েও সাড়া
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেও উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গেছে। তাদের ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যক্তিগত পর্যায়ের আবেদন গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম স্বল্পমেয়াদি সুকুক
এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম স্বল্পমেয়াদি সুকুক। এর আগে সরকার ১০টি সুকুক ইস্যু করেছিল, তবে সেগুলোর মেয়াদ ছিল ৫ ও ১০ বছর। এবার প্রথমবারের মতো ২৭৩ দিনের ইজারা সুকুক চালু করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ তৈরি করবে। মেয়াদ শেষে বিনিয়োগকারীরা মূলধনের সঙ্গে এককালীন মুনাফা পাবেন। ন্যূনতম বিনিয়োগের সুযোগ ছিল ১০,০০০ টাকা। এতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী, প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও অংশ নিয়েছে।
সুকুক ইস্যুর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এ পর্যন্ত সরকার ১১টি সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে মোট ৫৩,৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। ২০২৭ অর্থবছরে পাঁচটি সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে ২৯,৫০০ কোটি টাকা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। meanwhile, আসছে ২০২৮ অর্থবছরে সুকুকের মাধ্যমে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকা উত্তোলনের পরিকল্পনা করছে সরকার। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নে সুকুকের ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রচলিত সরকারি বন্ডের পাশাপাশি এই শরিয়াহ-ভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ একদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য বিকল্প ও টেকসই তহবিল উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



