ছয় এনবিএফআইয়ের আমানতকারীরা টাকা ফেরত ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করলেন
দেশের ছয়টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাদের আমানতের অর্থ ফেরত এবং আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে অ্যালায়েন্স অব সিক্স এনবিএফআইস ডিপোজিটরস রিকভারি কমিটির ব্যানারে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
আমানতকারীদের মূল দাবিসমূহ
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
- আগামী তিন বছরের মধ্যে নিজেদের আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য একটি সুস্পষ্ট পথনকশা প্রণয়ন করা।
- এই ছয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
- এনবিএফআই খাতে আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য ব্যাংক খাতের মতো সমমানের নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করা।
- লিকুইডেশন ও অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মতে, এই ছয় এনবিএফআই প্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে দুই হাজারের বেশি আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশিষ্ট নজরুলসংগীতশিল্পী নাশিদ কামাল। তিনি বলেন, সাত বছর ধরে বিভিন্ন এনবিএফআইয়ের আমানতকারীরা অব্যবস্থাপনা, দুর্বল সুশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল পদক্ষেপের কারণে আর্থিক দুর্ভোগের শিকার হয়ে আসছেন। ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন সংস্কার, আমানত সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা চালু হলেও এনবিএফআই খাতে কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
আরেক ভুক্তভোগী মুনিরা খান জানান, ২০২০ সাল থেকে তিনি ও তাঁর ছেলে পিপলস লিজিংয়ে আমানত রাখলেও এখন পর্যন্ত সেই টাকা ফেরত পাননি। তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই হাজার পরিবারের আমানত এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে। দেশের আইনের ওপর ভরসা করে আমরা নিজেদের অর্থ জমা রেখেছিলাম।’ মুনিরা খান আরও উল্লেখ করেন যে তাঁর এক বোন দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত এবং অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না, অথচ এনবিএফআইয়ে তাঁর নিজস্ব আমানত রয়েছে।
ভুক্তভোগী আক্তারি বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী লাভের আশায় প্রায় নিজের পেনশনের প্রায় ১৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেই টাকা ফেরত না পাওয়ায় প্রয়োজনমতো চিকিৎসাও করতে পারেননি তিনি। ঋণ নিয়ে বোঝা করবেন না বলে ঠিকভাবে চিকিৎসাও করেননি। গত পাঁচ মাস আগে তিনি মারা যান। এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে চলব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।’
প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় ও পটভূমি
ওই ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো ফার্স্ট ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। দেশে গত জানুয়ারি মাসে ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পরে এই তালিকা থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, কিন্তু এই ছয় প্রতিষ্ঠান এখনও সমস্যাগ্রস্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নাশিদ কামালসহ ভুক্তভোগী মুনিরা খান, শায়লা বানু, আক্তারি বেগম, জালাল উদ্দিনসহ অন্য ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের সম্মিলিত দাবি হলো সরকার যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আমানতকারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।



