ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে ১১৫ দিন আটকে থাকা তেলবাহী ট্যাংকার 'নর্ডিক পোলাক্স' অবশেষে নিরাপদে প্রণালি পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। জাহাজটি ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহন করছে, যা বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে (ইআরএল) সরবরাহ করা হবে।
জাহাজের পথ ও সময়সূচি
জাহাজটি গত ১ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে ক্রুড তেল বোঝাই করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজটি সেখানে আটকা পড়ে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিধিনিষেধ আংশিক শিথিল হওয়ার পর জাহাজটি হরমুজ পাড়ি দেয়। আগামী ৬ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে অবস্থান করছে।
তেল সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
এই তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে সরবরাহ করা হবে। সেখানে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তা সারাদেশে বিতরণ করা হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে এই পরিবহন কার্যক্রম তদারকি করছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। এই চালানের জন্য তারা বিদেশি পতাকাবাহী ট্যাংকারটি ভাড়া করেছে।
বিকল্প রুট ও ডেমারেজ খরচ
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পরপরই কর্পোরেশন বিকল্প সরবরাহ রুট ব্যবহার শুরু করে। বিকল্প রুট হিসেবে সৌদি আরবের ইয়ানবু ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে জ্বালানি তেল পরিবহন করা হচ্ছে। এই বিকল্প চালানের কারণে দেশজুড়ে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। নর্ডিক পোলাক্স ১ মার্চ রাস তানুরায় অপরিশোধিত তেল বোঝাই করেছিল এবং এই সপ্তাহ পর্যন্ত সেখানেই আটকে ছিল।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ বিলম্বের কারণে বিপুল পরিমাণ ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) ব্যয় হলেও বিএসসি বা বিপিসি কাউকেই এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হবে না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই এই ডেমারেজ খরচ বহন করবে। সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরই কেবল নিয়মিত হরমুজ প্রণালি রুটটি পুনরায় ব্যবহার শুরু হবে।
জ্বালানি আমদানি ও সংকট
বাংলাদেশ সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো ও আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডিএনওসি) থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সাধারণত সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রাস তানুরা থেকে এবং আরব আমিরাতের তেল জেবেল আলী হয়ে রফতানি করা হয়। এই দুটি রুটই হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে গেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে এই কৌশলগত নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে নর্ডিক পোলাক্স আটকে পড়ে। এর ফলে ইআরএল উৎপাদন সংকটে পড়ে। ক্রুড তেলের অভাবে ১৪ এপ্রিল ইআরএলের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়ে সাময়িক সংকট দেখা দেয়।
এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার চড়া মূল্যে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি শুরু করে। একইসঙ্গে ক্রুড তেল আমদানির জন্য সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর হয়ে বিকল্প রুটে স্থানান্তর করা হয়।



