প্রথমার্ধে সেনেগাল ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। আর একটু হলেই গোল পেতে পারতো তারা। ফিরে আসার সম্ভাবনা ছিল ২০০২ বিশ্বকাপে হারের দুঃসহ স্মৃতি। কিন্তু এমবাপ্পে–ওলিসরা তা হতে দেননি। এমবাপ্পের রেকর্ডের দিনে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে ফ্রান্স ৩-১ গোলে সেনেগালকে হারিয়ে দারুণ সূচনা করেছে। এমবাপ্পে করেছেন একাই দুই গোল।
প্রথমার্ধের লড়াই
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু থেকে দর্শকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। সমস্বরে ‘ওলে, ওলে, ওলে’ ধ্বনি দিচ্ছিলেন। সবকিছুই যেন ফ্রান্সের জন্য। কিন্তু এমবাপ্পেরা প্রথমার্ধে সমর্থকদের মন জয় করতে পারেননি। বরং সেনেগাল আর একটু হলেই লিড পেতে পারতো। বিশ্বকাপ ফুটবলে দুই দলের প্রথমার্ধ তাই গোলশূন্য সমতায় শেষ হয়েছে।
গ্রুপ ‘আই’-এর ম্যাচে ৪-২-৩-১ ছকে খেলছে ফ্রান্স। আক্রমণে এগিয়ে ছিল দেশমের দল। তবে ক্লিয়ার কোনো সুযোগ বের করতে পারেনি। এমবাপ্পে ছিলেন কিছুটা নিজের ছায়া হয়ে। ম্যাচের ১০ ও ১৩তম মিনিটে এমবাপ্পে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পোস্টে শট নেওয়ার আগেই সেনেগালের ডিফেন্ডাররা ক্লিয়ার করেন। রিয়াল মাদ্রিদের তারকাকে কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। কুলিবালি ও ক্রেপিন দিয়াতা ভালোই মার্কিং করে রেখেছেন।
দেম্বেলেও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। ১৮ মিনিটে দেম্বেলের শট দিয়াতা ক্লিয়ার করে পোস্টের দিকে বল যেতে দেননি। সেনেগাল প্রতি আক্রমণ থেকে সিংহের মতো গর্জে উঠেছে। ২৫ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে সেনেগাল আর একটু হলেই গোল পেতে পারতো। সতীর্থের দারুণ এক পাস থেকে বক্সে ঢুকে নিকোলাস জ্যাকসনের শট পোস্টের নিচে লেগে প্রতিহত হওয়ায় অল্পের জন্য গোল পাওয়া হয়নি সেনেগালের। শুধু তাই নয়, বল পোস্টে লেগে আবার গোলরক্ষকের পায়ে লেগে গোললাইন পর্যন্ত এসে থেমে যায়।
৩৯ মিনিটে কুন্দের কাটব্যাক থেকে ঠিকভাবে নিজের পায়ে বল জমাতে পারেননি এমবাপ্পে। বল মিস হলে আর শট নেওয়া সম্ভব হয়নি। যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে ইসমাইলা সার সহজ সুযোগ মিস করলে আক্ষেপ বাড়ে সেনেগালের। সাদিও মানের পাসে ইসমাইলা ফাঁকায় থেকে পোস্টের ওপর দিয়ে মেরে সুযোগ নষ্ট করেন।
দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের প্রত্যাবর্তন
বিরতির পর ফ্রান্স নিজেদের খেলায় ফেরে। হতাশা ঝেড়ে দারুণ পারফরম্যান্সে তাদের শট বক্সের ২৫ গজ দূর থেকে দুয়ের জোরালো শট পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে যায়। ৫৩ মিনিটে ফ্রান্সের আরেকটি আক্রমণ। আবারও হতাশ হতে হয় ফ্রেঞ্চ দর্শকদের। ওলিসের শট গোলকিপারের দৃঢ়তায় কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা পায়। ৫৬ মিনিটে সেনেগালের একটি প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়।
দুই মিনিট পর এমবাপ্পে গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন। বক্সে ঢুকে গোলকিপার মেন্দিকে একা পেয়ে নেওয়া শট জালে জড়াতে পারেনি। বল মেন্দির পায়ে লেগে প্রতিহত হয়। একটু পর ফ্রান্সের পেনাল্টি আবেদন ভিএআর দেখে বাতিল হলে সেনেগাল সমর্থকদের উল্লাস ছিল দেখার মতো। ৬৪ মিনিটে ওলিসের দারুণ এক পাস থেকে এমবাপ্পে ফাঁকায় থেকে শট নিতে পারেননি।
এমবাপ্পের গোল
দুই মিনিট পর ফ্রান্স অবশেষে গোলের দেখা পায়। ওলিসের পাসে ডান পায়ে এমবাপ্পে মেন্দিকে পরাস্ত করেন। ৬৬ মিনিটে ফ্রান্স অবশেষে গোলের দেখা পেল। ওলিসের পাসে ডান পায়ে এমবাপ্পে দারুণ ফিনিশে মেন্দিকে পরাস্ত করেন। এতে এগিয়ে যায় দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এমবাপ্পের এই গোলের পর বল জালে জড়িয়েছিল সেনেগালও। যদিও গোলটি বাতিল হয় অফসাইডের কারণে।
এরই সঙ্গে ফ্রান্সের হয়ে এখন পর্যন্ত ৫৬ গোল করেছেন ২৭ বছর বয়সী এই তারকা। দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা অলিভিয়ে জিরুর রেকর্ডে ভাগ বসালেন তিনি। বিশ্বকাপেও এমবাপ্পের গোলসংখ্যা ঈর্ষণীয়। ফ্রান্সের জার্সিতে তার ৫৭ গোলের ১২টিই এসেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের মালিক জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ড ছুঁতে এমবাপ্পের দরকার আর মাত্র তিনটি গোল।
বারকোলার গোল
এমবাপ্পের পর ব্রাডলি বারকোলা ৮২ মিনিটে উল্লাসে ভাসান সমর্থকদের। মাঠে নামার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে ফ্রান্সকে ২–০ গোলে এগিয়ে দেন তিনি। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে উসমান দেম্বেলের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন এই ফরোয়ার্ড। আদ্রিয়াঁ রাবিওর থ্রু পাস ধরে ঠাণ্ডা মাথায় গোলকিপারের ওপর দিয়ে ডান পায়ে বল জালে পাঠান এই পিএসজি তারকা।
শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা
৯০ মিনিটে সেনেগাল এক গোল শোধ দেয়। ইব্রাহিমের জোরালো শট গোলকিপারের হাতে লেগে জড়িয়ে যায় পোস্টে। যোগ করা সময়ে এমবাপ্পে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এতে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে সেনেগাল। এমবাপ্পেদের জয়োল্লাস শুরু হয়।
এর আগে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম একই জাতীয় দলকে চারটি বিশ্বকাপে কোচিং করানো ইতিহাসের ষষ্ঠ কোচ হিসেবে নিজের পথচলা শুরু করেন। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—টানা চারটি বিশ্বকাপেই তিনি ফ্রান্সের দায়িত্বে আছেন। দেশমের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ অভিযানের শুরুটা হলো দেখার মতোই।



