বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম বাচ্চু: প্রত্যন্ত গ্রামের গর্ব
বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম বাচ্চু: গ্রামের গর্ব

৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের বাচ্চু রহমান। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বাচ্চু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জন করেছেন। তার এই অর্জনে গ্রামজুড়ে আনন্দের জোয়ার বইছে এবং লাখো তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষাজীবন

বাচ্চু রহমানের বাবা নজরুল ইসলাম আনসার বাহিনীর সদস্য এবং মা বিলকিস বেগম গৃহিণী। দুই সন্তানের মধ্যে বাচ্চু ছোট। তিনি কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন।

বিসিএস প্রস্তুতির কৌশল

কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্র হওয়ায় বাচ্চু কখনোই মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বিষয়গুলোর গভীরে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতেন কেন ঘটছে এবং সমাধান কী। বিসিএসের প্রথাগত বইয়ের বাইরে নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়তেন। তার মা বিলকিস বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কত অভাব অনটন, তার মধ্যেও ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা ছিল ওর বাবার। চাকরির যে টাকা প্রায় সব চলে যেতো তাদের পড়াশোনায়। ছোটবেলা থেকে বাচ্চু পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল না। জেএসসি পরীক্ষার পর স্কুলের পিকনিক থেকে ফিরে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়। দিন কিংবা রাত বই নিয়ে ঘর উঠান কিংবা বাগানে পড়েছে। অনেক সময় বই কেড়েও নিতে হয়েছে তার কাছ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সময়ে অনেক কষ্ট করেছে। তার এই কষ্টের পুরস্কার দিয়েছেন আল্লাহ।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশ ক্যাডার বেছে নেওয়ার কারণ

বাচ্চু রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার। কারণ বাবা আনসার সদস্য ছিলেন। তার ইউনিফর্ম, বুট, বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছি। তখন থেকেই মনে হতো, পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে চাকরি করবো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি, বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি হওয়া যায়। তখনই লক্ষ্য স্থির করি— পুলিশ ক্যাডারেই যাবো। ক্যাম্পাস জীবনে প্রচুর পত্রিকা পড়তাম। এতে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠতো। এগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থেকেই এই ক্যাডারের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। ৪৯তম বিসিএসে মার্কেটিংয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। শিক্ষকতা অবশ্যই সম্মানজনক পেশা। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, পুলিশে থেকে মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার সুযোগ বেশি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই পুলিশ ক্যাডার বেছে নিয়েছি। পদ বা পদবি নয়; একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত ডাক্তার বা পুলিশের কাছে যায়। এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে ভুক্তভোগী মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা পান। সততার সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।’

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়েছিলেন বাচ্চু। কিন্তু হাল ছাড়েননি। ৪৯তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হন। কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যর্থতার স্তূপ ডিঙিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চু রহমানের দেশসেবার এই অনন্য কৃতিত্বে আজ গর্বিত পুরো কেশবপুরবাসী। বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী ছিল। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক কৌশল আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই ছোঁয়া সম্ভব। এই সাফল্য আজ দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশীর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা ও শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’