আজ ৮ মে শতবর্ষে পা রাখলেন ভ্রমণ ও অভিযাত্রার ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। তাঁর শান্ত ও নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর সাত দশক ধরে আমাদের প্রাকৃতিক বিশ্বের গল্প শুনিয়ে আসছে। ৭০ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; একের পর এক ঝুঁকি গ্রহণ ও নতুন প্রযুক্তিকে আলিঙ্গন করে পৃথিবীর দুর্গম ও বিপজ্জনক সব প্রান্তে দুঃসাহসী অভিযানের মহাকাব্য রচনা করেছেন।
লাইফ অন আর্থ: এক বিপ্লবী সৃষ্টি
স্যার অ্যাটেনবরোর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল প্রাকৃতিক জগতের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা চালানো। চার বছর ধরে পৃথিবীর ১০০টির বেশি স্থানে শুটিং করার পর ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় ‘লাইফ অন আর্থ’। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রকৃতিবিষয়ক তথ্যচিত্র, যার নির্মাণ ব্যয় ১০ লাখ পাউন্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একাধিক অধ্যাপক স্বীকার করেছেন, তাঁরা ‘লাইফ অন আর্থ’ দেখেই জীববিজ্ঞানী হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন। ব্যাঙ, বিটল, মাংসাশী উদ্ভিদ থেকে শুরু করে ট্রপিক্যাল প্রজাপতির ৫০টির বেশি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। এমনকি ২০২৫ সালে একটি বিশেষ ছত্রাকও তাঁর সম্মানে ‘অ্যাটেনবরোআই’ রাখা হয়েছে।
বিবিসি ও জু কোয়েস্টের যুগান্তকারী পদক্ষেপ
যুক্তরাজ্যের মিডেলসেক্সের আইসেলওর্থে জন্মগ্রহণ করা স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো ১৯৫২ সালে বিবিসিতে যোগ দেন। যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি ‘জু কোয়েস্ট’ নামের একটি অনুষ্ঠানের বৈপ্লবিক ধারণা নিয়ে আসেন। এটিই ছিল প্রথম সিরিজ, যেখানে স্টুডিওর উপস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি বন্য পরিবেশে ধারণ করা ফুটেজের সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে অ্যাটেনবরো বলেন, ‘আমরা তখন ভাবতাম প্রকৃতি অফুরন্ত, প্রাণীতে ঠাসা। চিড়িয়াখানায় কোনো প্রাণী মারা গেলে আমরা অনায়াসেই জঙ্গল থেকে আরেকটি নিয়ে আসতাম। এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে এটা কল্পনাও করা যায় না।’ এই সিরিজের মাধ্যমেই কোমোডো ড্রাগনের মতো রহস্যময় প্রাণী প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়।
প্রযুক্তির পথিকৃৎ
১৯৬৭ সালে বিবিসি টু চ্যানেলের কন্ট্রোলার থাকাকালে অ্যাটেনবরো ইউরোপের মধ্যে প্রথম রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচার চালুর কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি চেয়েছিলেন রঙিন সম্প্রচারে জার্মানিকে টেক্কা দিতে এবং উইম্বলডন টেনিস প্রতিযোগিতার সময় মাত্র চারটি রঙিন ক্যামেরা দিয়ে তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ‘সিভিলাইজেশন’ ও ‘দ্য অ্যাসেন্ট অব ম্যান’–এর মতো বড় বাজেটের তথ্যচিত্র নির্মিত হয়। বলা হয়, এসব তথ্যচিত্র বিশ্বজুড়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের মানদণ্ড তৈরি করে দেয়। তবে প্রশাসনিক উচ্চপদে থাকা সত্ত্বেও তাঁর মন পড়ে থাকত ক্যামেরার সামনে। তাই ১৯৭৩ সালে তিনি সব পদ ছেড়ে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার
স্যার অ্যাটেনবরো সব সময়ই প্রকৃতির জটিলতা আরও নিপুণভাবে দেখাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। ২০০১ সালের ‘ব্লু প্ল্যানেটে’ ব্যবহৃত লো-লাইট ক্যামেরায় গভীর সমুদ্রের ডাম্বো অক্টোপাস বা হেয়ারি অ্যাঙ্গলারফিশের মতো বিচিত্র সব প্রাণীর জীবনযাপন প্রথমবার ক্যামেরাবন্দী করেন। ২০০৬ সালের ‘প্ল্যানেট আর্থ’ ছিল হাইডেফিনেশন (এইচডি) প্রযুক্তিতে ধারণ করা প্রথম ওয়াইল্ডলাইফ সিরিজ। স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সাদাকালো, রঙিন, হাইডেফিনেশন, থ্রি-ডি এবং ফোর-কে ফরম্যাটে নির্মিত অনুষ্ঠানের জন্য বাফটা পুরস্কার জয় করেছেন। এমনকি ৮৯ বছর বয়সে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে এক হাজার ফুট পানির নিচে সাবমার্সিবল নিয়ে নেমে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েন। তাঁর হাত ধরে তথ্যচিত্রজগতে ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) প্রযুক্তিরও সফল অভিষেক ঘটে।



