জাতীয় প্রতিযোগিতায় প্রথমবার নেমেই রুপা জিতেছে ১৪ বছরের কিশোরী স্পৃহা। কাল জাতীয় স্টেডিয়ামে তার পাশে ছিলেন বাবা ফিরোজ আলম।
মায়ের সাইকেলই ছিল পরম সঙ্গী
কয়েক বছর ধরে মায়ের রেখে যাওয়া সাইকেলটাই ছিল দিনাজপুরের মেয়ে স্পৃহা আলমের পরম সঙ্গী। সেই জরাজীর্ণ হ্যান্ডেলবার ছুঁয়েই সে অনুভব করত মায়ের অস্তিত্ব। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, যে সাইকেল নিয়ে সে জাতীয় পদকের স্বপ্ন বুনেছে, প্রতিযোগিতার আগের রাতেই সেটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অকেজো হয়ে পড়ে। মুহূর্তের জন্য স্পৃহার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়। তবু থামলে তো চলবে না; মাকে দেওয়া কথা যে তাকে রাখতেই হবে।
১৫ কিলোমিটারের লড়াই
কাল ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে ৪৫তম জাতীয় সাইক্লিংয়ে স্পৃহা যখন ১৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছিল, তার প্রতিটি প্যাডেল বোধ হয় হারানো মাকেই খুঁজে ফিরেছে। মায়ের স্মৃতিমাখা সাইকেলটা অচল হয়ে পড়ায় শেষমেশ অন্যের কাছ থেকে একটি সাইকেল ধার করতে হয়েছে তাকে। একদম অপরিচিত সাইকেলে ভারসাম্য মেলাতে যখন কষ্ট হচ্ছিল, স্পৃহা তখন চোখ বুজে শুধু মাকেই স্মরণ করেছে। ১৫ কিলোমিটারের কঠিন লড়াই শেষে যখন ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করে স্পৃহা, তখন তার চোখেমুখে রুপালি হাসি।
প্রথমবারেই সাফল্য
প্রথমবার জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই এমন রোমাঞ্চকর সাফল্যে কিছুটা অভিভূত ১৪ বছর বয়সী স্পৃহা। বিজয় মঞ্চ থেকে নেমে তার প্রথম কথাটা ছিল মাকে নিয়েই, ‘মায়ের সাইকেলটা নিয়ে নামতে পারলে বেশি ভালো লাগত। কিন্তু ওটা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ভেবেছিলাম আর জেতা হবে না। তবে আশা ছাড়িনি। কারণ, মাকে কথা দিয়েছিলাম। সে কথা রেখেছি।’
বাবার গর্ব
মেয়ের এই লড়াকু মেজাজ দেখে গর্বিত বাবা ফিরোজ আলমও। ১৯৯৫ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশের তারকা সাইক্লিস্ট। জাতীয় পর্যায়ে জিতেছেন ২৯টি পদক। কাল মেয়ের হাতে পদক দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি, ‘রাতে যখন ওর মায়ের সাইকেলটা নষ্ট হয়ে গেল, ও খুব কাঁদছিল। ভেবেছিল সব শেষ। আমি শুধু বলেছিলাম, সাহস রাখ। আজ (কাল) ও যখন অন্যের সাইকেলে চড়েই রুপা জিতল, আমার মনে হলো ওর মা আকাশ থেকে হাসছে। ওর মাকে দেওয়া কথা ও রেখেছে। এটাই আমার বড় পাওয়া।’
কোচের প্রশংসা
স্পৃহার এই ঘুরে দাঁড়ানো দেখে মুগ্ধ তাঁর কোচ মো. উজ্জল। তিনি বলছিলেন, ‘একজন অ্যাথলেটের জন্য একদম শেষ মুহূর্তে অন্য কারও সরঞ্জাম নিয়ে নামাটা মানসিকভাবে বিশাল চাপের। স্পৃহা সেই চাপকে শক্তিতে রূপান্তর করেছে। ওর নিজের সাইকেলটা ঠিকভাবে চলেনি, এ জন্য ও কিছু সময়ের জন্য ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েনি। প্রথমবার জাতীয় পর্যায়ে খেলতে এসেই ওর এমন সাফল্য দেখে আমি সত্যি খুব খুশি। ও পুরোপুরি ওর মায়ের মতোই হয়েছে। সব প্রতিকূলতাকে জয় করতেও শিখে ফেলেছে।’
মায়ের উত্তরাধিকার
মা পারুল আক্তারও ছিলেন দেশের অন্যতম সেরা সাইক্লিস্ট। ২০০৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায় থেকে ৪৭টি পদক জিতেছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সাইকেলটাই হয়ে ওঠে স্পৃহার বড্ড আপন। কাল মায়ের সাইকেলটি নিয়ে হয়তো ট্র্যাকে নামেনি, কিন্তু মায়ের লড়াকু চেতনা ঠিকই স্পৃহার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে মিশে গেছে। এটাকে তাই আর দশটি সাধারণ জয়ের মতো ভাবাও ঠিক হবে না, এ যেন এক মেয়ের তার প্রয়াত মাকে দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। স্পৃহাও শান্ত গলায় বলতে পারে—‘মা, আমি পেরেছি।’



