সিলেটে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বিকেলে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তিনি খুদে ক্রীড়াবিদদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা স্পোর্টসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরবে। প্রত্যেকে একেকজন বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হবে।’
খেলাধুলার মাধ্যমে দেশের প্রতিনিধিত্ব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, খেলাধুলার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বিশ্বে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার জন্য খুদে ক্রীড়াবিদদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি খুদে ক্রীড়াবিদদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাস আছে, তাই না? দূতাবাস যে রকম আছে, সেখানে আমাদের অ্যাম্বাসেডর আছেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলে তাঁরা বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। আমি চাই, তোমরা যারা এখানে বসে আছো, সারা বাংলাদেশে আজকে যারা স্টেডিয়ামগুলোতে বসে আছো ছোট বন্ধুরা, ইনশা আল্লাহ তোমরা স্পোর্টসের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরবে।’
খুদে ক্রীড়াবিদরাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ
খুদে ক্রীড়াবিদ ও শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘তোমাদের বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে হবে। তোমাদের মধ্যে থেকে ইনশা আল্লাহ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে। তোমাদের মধ্যে থেকে ইনশা আল্লাহ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের বড় ডাক্তার, আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে। তোমাদের ভেতর থেকে ভবিষ্যতে ইনশা আল্লাহ আন্তর্জাতিক মানের নেতৃত্ব তৈরি হবে। এ দেশকে তোমরা নেতৃত্ব দেবে। তোমাদের মধ্যে থেকে এমপি হবে, মন্ত্রী হবে, প্রধানমন্ত্রী হবে, প্রেসিডেন্ট হবে। তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ।’
পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পড়ালেখা তো সবাইকে করতে হবে, পড়ালেখা কিন্তু মাফ করা যাবে না। কিন্তু পড়ালেখার পাশাপাশি প্রত্যেককে খেলতে হবে। নিজেদের তৈরি করতে হবে। তোমাকে ঠিক করে নিতে হবে, তুমি কী করবে এবং তুমি যখন নিজেকে ঠিক করে নিতে পারবে, নিজের লক্ষ্যকে স্থির করে নিতে পারবে, তখন সেই টার্গেট অ্যাচিভ করার জন্য সামনের দিকে তোমাকে এগোতে হবে।’
এরপর তারেক রহমান বলেন, ‘খেলার ক্ষেত্রে হোক, পড়ালেখার ক্ষেত্রে হোক, সরকার থেকে আমরা আমাদের দেশের যেই সামর্থ্য আছে, যতটুকু আমাদের ক্যাপাবিলিটি আছে, আমরা আমাদের ছোট বন্ধুদের পাশে আছি। কেউ গায়ক হবে, কেউ মিউজিশিয়ান হবে। একেকজন একেকটা হবে। সরকার, রাষ্ট্র তোমাদের পাশে আছে। কারণ, ওই যে একটু আগে বলেছি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। তোমরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।’
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে বেলা পৌনে চারটায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। এরপর নিজের বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, ক্রীড়াঙ্গনে তৃণমূল থেকে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ করতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও বিকাশের সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে জানানো হয়, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ ক্রীড়াবিদ গড়ে তুলতে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্সের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এতে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের সুপ্ত ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ, বাছাই এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের মেধাবিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। আটটি ইভেন্টে প্রতিযোগিতা হবে। এগুলো হচ্ছে ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, মার্শাল আর্ট, সাঁতার ও দাবা।
বাসিয়া খালের পুনঃখনন উদ্বোধন
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধনের আগে সিলেট সদর উপজেলার বাসিয়া খালের পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে সেখানে এক সভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকারকে আপনারা নির্বাচিত করে ক্ষমতায় পাঠিয়েছেন। সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে দেশের মানুষের স্বার্থ দেখা। এই সরকারের এক নম্বর দায়িত্ব হচ্ছে এ দেশের মানুষের সমস্যার সমাধান করা।’
বেলা ১টা ১০ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রী বাসিয়া খাল এলাকায় পৌঁছান। তিনি খালে নেমে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খননকাজের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে বাসিয়া নদীতে খননে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। এরপর নদীর পাড়ে গাছ লাগান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকার হচ্ছে কৃষকবান্ধব সরকার। আমরা কৃষক কার্ড চালু করেছি। ধীরে ধীরে সারা বাংলাদেশের কৃষক ভাইদের আমরা কৃষক কার্ড পৌঁছে দেব। এই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ, কীটনাশকের সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি আড়াই হাজার টাকা পাবেন।’
বাসিয়া নদীর খননকাজ সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান করে গিয়েছিলেন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সেই ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করেছিলেন। এই খালটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এই খালটা যদি আমরা কাটি, প্রায় ৮০ হাজার কৃষকের সরাসরি উপকার হবে। আর এই ৮০ হাজারের বাইরে আরও দেড় লাখ কৃষক পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন। এই খালটা কাটলে এই খালের দুই পাশে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন ফসল বেশি উৎপাদন হবে।’
কৃষকদের জন্য সরকারের উদ্যোগ
বিএনপি সরকার গঠনের আগে দেওয়া কথা রেখেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে কৃষক ভাইদের যাদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ছিল, আমরা সুদসহ মওকুফ করব। নির্বাচনের পরে আমরা ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু আমাদের কথাটা রেখেছি। যে ১০ হাজার টাকা কৃষি লোন ছিল ১২ লাখ কৃষকের, এই ১২ লাখ কৃষকের কৃষিঋণটা আমরা মওকুফ করে দিয়েছি সুদসহ। আমরা চাই, এই দেশের কৃষক ভাইয়েরা ভালো থাকুক। আমরা চাই গ্রামের মানুষ ভালো থাকুক।’
বিএনপি জনগণের হয়ে কাজ করবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের একমাত্র জবাবদিহি হচ্ছে এই দেশের মানুষের কাছে, এই দেশের জনগণের কাছে। সে জন্যই আমরা সেই সব কর্মসূচি পালন করতে চাই। দেশে কর্মসংস্থানের জন্য বন্ধ থাকা মিল-কারখানা নতুন করে চালু এবং বিশ্বের যেসব দেশে তরুণেরা কাজের জন্য যেতে চায়, সেসব দেশে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একপর্যায়ে উপস্থিত জনতা তারেক রহমানকে ‘সিলেটি জামাই’ উল্লেখ করে ‘দুলাভাই, দুলাভাই’ স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের থামতে বলেন। এতেও স্লোগান না থামলে তারেক রহমান বলেন, ‘দুলাভাইকে কথা বলতে না দিলে তো দুলাভাই যাবে গিয়া। যাই আমি? কথা বলব, না যাব?’ উপস্থিত জনতার মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। তাঁরা কথা বলার অনুরোধ জানালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাহলে চুপ করতে হবে। আমি কথা বলি, তাহলে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে শুনতে হবে কথা।’
কর্মিসভায় প্রধানমন্ত্রী
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নগরের শাহি ঈদগাহ এলাকার জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে যান। সেখানে জেলা ও মহানগর বিএনপির কর্মিসভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এতে সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় এ সভা শেষ হয়।
কর্মিসভায় সিলেটের দুজন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, সিলেট বিভাগের বিএনপির সংসদ সদস্য, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।



