দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) সভাপতি পদে আবারও নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন কাজী সালাউদ্দিন। তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হবেন বলে জানা গেছে। গত ৩১ মে ছিল মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। কিন্তু সভাপতি পদে সালাউদ্দিন ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেননি। মনোনয়নপত্র সঠিক থাকলে কাজী সালাউদ্দিনই সভাপতি নির্বাচিত হবেন। আগামী ১ আগস্ট সাফের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
টানা পাঁচ মেয়াদে সভাপতি
টানা চার মেয়াদে সাফের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন সালাউদ্দিন। এবার চূড়ান্ত ঘোষণা হলে তিনি টানা পাঁচ মেয়াদে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন। প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ফুটবল প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সালাউদ্দিনের সময়কাল ঘিরে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ইতিহাস রয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ
২০২৩ সালে উচ্চ আদালত বাফুফের তৎকালীন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বাফুফের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। সেই ঘটনার পর থেকে বাফুফের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করে।
বয়সসীমার বাধা অতিক্রম
সাফের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২৫ বছরের কম ও ৭২ বছর বয়সের বেশি ব্যক্তিরা নির্বাচনে অযোগ্য। কাজী সালাউদ্দিনের জন্ম ১৯৫৪ সালে, বর্তমানে তার বয়স ৭১ বছর। সাফের বর্তমান কমিটির মেয়াদ চলতি মাসেই শেষ হবে। বিদ্যমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বয়সের কারণে ২০২৬ সালের নির্বাচনে সালাউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ ছিল না। তবে সভায় বয়সের বিষয়টি উঠে গেলে সাফে তার ফের প্রার্থী হওয়ার পথে বাধা থাকে না।
রাজনৈতিক পটভূমি
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দহরম-মহরম ছিল সাবেক বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের। ক্রীড়াঙ্গনে ফ্যাসিস্টের দুই দোসরের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন পালিয়ে গেলেও রয়ে গেছেন সালাউদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সালাউদ্দিন দেশ ছাড়ার নানা উপায় খুঁজছিলেন। অবশেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সালাউদ্দিন ও তার সহযোগী বাফুফের সদস্য মাহফুজা আক্তার কিরণের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে।
‘এইতো আপার কাছ থেকে আসলাম’—‘আপা ফোন করেছিলেন, কালকেই যেতে বললেন’—এভাবেই বিভিন্ন সময়ে নিজেকে জাহির করতেন সালাউদ্দিন। আর সালাউদ্দিনের এই ‘আপা’ অন্য কেউ নন, খোদ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের শেষ দিকে বাফুফের সভাপতি হয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর পর্যন্ত গদি দখলে রেখেছিলেন তিনি। শুধু শেখ হাসিনাই নয়, সালাউদ্দিনের দহরম-মহরম ছিল শেখ রেহানার ছেলে ববি সিদ্দিকীর সঙ্গেও। ববি সিদ্দিকীর আশ্রয়-প্রশ্রয়েই ফুটবলাঙ্গন তথা ক্রীড়াঙ্গণে একজন দানবে পরিণত হয়েছিলেন সালাউদ্দিন। শেখ হাসিনার পতনের পর টেলিফোনে তার খোঁজখবর রাখতেন সালাউদ্দিন। এখন আর টেলিফোনে নয়, শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন ফুটবলের এই দুর্নীতিবাজ সম্রাট।
বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
৫ আগস্টের পর কয়েক দফা বিদেশে যাতায়াত করেছিলেন সালাউদ্দিন। তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের হওয়ার পর বৈধভাবে বাংলাদেশের সীমান্ত পেরোনো তার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সেই নিষেধাজ্ঞা কাটানোর নতুন ফন্দি এঁটেছেন ফ্যাসিস্টের এই দোসর। মৃতপ্রায় সাফের সভাপতি পদকে ব্যবহার করে তিনি দেশ-বিদেশ যাতায়াত করেন।
বাফুফের বর্তমান সভাপতি তাবিথ আউয়াল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির কাছে কাজী সালাউদ্দিনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর। সালাউদ্দিনের দোসর ও বাংলাদেশ যুবলীগের সাবেক মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মাহফুজা আক্তার কিরণের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য পৃথক আরেকটি চিঠি দিয়েছেন তাবিথ আউয়াল। এর ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসবি ও দুদকের মতামত চেয়েছিল। দুদক জানিয়েছিল সালাউদ্দিনের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তারপরও সালাউদ্দিন ও কিরণের বিদেশ সফরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আমলের পুরোটা সময়েই অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটে ব্যস্ত ছিলেন সালাউদ্দিন-কিরণরা—এমন অভিযোগ রয়েছে। বাফুফের নানা আর্থিক অনিয়ম, ফিফার নিষেধাজ্ঞা, কোটি কোটি টাকার তহবিল তছরুপ নিয়ে চলমান বিতর্ক এখনো থামেনি।



