বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য আকাশচুম্বী, বাংলাদেশে শঙ্কা
বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য আকাশচুম্বী, বাংলাদেশে শঙ্কা

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে সব কিছুর দামই এখন আকাশচুম্বী। টিকিটের দাম থেকে শুরু করে সম্প্রচার স্বত্বও চূড়ায় উঠতে শুরু করেছে। যে কারণে চীন, ভারতে সম্প্রচার নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। একই অবস্থা বাংলাদেশেরও।

বিটিভির সামনে দামের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুর ভিত্তিক মিডিয়া সংস্থা ‘স্প্রিংবক’। কিন্তু তারা এখন সেটি সম্প্রচারের জন্য বিটিভির কাছে যে পরিমাণ অর্থ চেয়েছে, তা দেশের একমাত্র সরকারি টেলিভিশনের বাজেটকেই প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে। তাতে বাংলাদেশে পুরো মৌসুম বিশ্বকাপ দেখা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘স্প্রিংবক আমাদের কাছে ১৫১ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া এর সঙ্গে ট্যাক্স ও ভ্যাট মিলিয়ে সেটা দুইশ কোটি টাকা দাঁড়াবে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তার পরেই ওই কর্তা জানান এত অর্থ দিয়ে আসলে বিটিভির মতো প্রতিষ্ঠানের খেলা দেখানো অসম্ভব। তার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, ‘আসলে এত টাকা দিয়ে বিটিভির পক্ষে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব কেনা সম্ভব নয়। বিটিভির সারা বছরের বাজেটই আছে তিনশ কোটি টাকা। এর মধ্যে যদি আমরা দুইশ কোটি টাকা দিয়ে সম্প্রচার স্বত্ব কিনি, তাহলে টেলিভিশন চলবে কী করে? সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এত টাকা দিয়ে স্বত্ব কিনে বিটিভি তো কোনওভাবেই লাভ করতে পারবে না। বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাতার বিশ্বকাপের ক্ষতির অভিজ্ঞতা

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব ৯৮ কোটি টাকায় কিনেছিল বিটিভি। যার কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল দেশের একমাত্র সরকারি টেলিভিশনকে। এ নিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘কাতার বিশ্বকাপে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা নিয়ে পরবর্তীতে বিটিভিকে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আমরা বিজ্ঞাপন থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ করতে পারলেও বিনিয়োগের পুরো টাকা আসেনি। বড় ক্ষতি হয়েছিল। এখন সরকার যদি মনে করে, বিটিভির মাধ্যমে বিশ্বকাপ দেখাবে, তাহলে হয়তো সম্ভব। এছাড়া এই মুহূর্তে অন্য কোনও বিকল্প নেই।’

বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার জটিলতা

শেষ পর্যন্ত যদি বাংলাদেশেও বিশ্বকাপ সম্প্রচার না হয় তাহলে বিশ্বের একটি বড় অংশই সম্প্রচার তালিকার বাইরে চলে যাবে। কিছুদিন আগেই যেমন রয়টার্সকে ফিফা জানিয়েছিল যে তারা ১৭৫টিরও বেশি অঞ্চলের সঙ্গে সম্প্রচার চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এটা সত্য হলেও বাস্তব চিত্র আরও জটিল। কারণ এখনও পাকিস্তান, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। তার ওপর ভারত ও চীনসহ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল কয়েকটি দেশও ফিফার সম্প্রচার তালিকার বাইরে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ জনসংখ্যা এই সম্প্রচার কাভারেজের বাইরে রয়ে গেছেন।

টাইম জোন সমস্যা ও দামের অমিল

বিশ্লেষকদের মতে, বাদ পড়া দেশগুলোর বড় অংশই একই অঞ্চলের, মূলত টাইম জোন সমস্যা। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সাড়ে ৯ ঘণ্টা এবং চীন ১২ ঘণ্টা এগিয়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলো সেখানে বেশিরভাগ সময় গভীর রাত বা ভোরে সম্প্রচার হবে।

এর বিপরীতে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সময়ের পার্থক্য ছিল তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক সময়ে। ভারতের সঙ্গে ব্যবধান ছিল মাত্র আড়াই ঘণ্টা এবং চীনের সঙ্গে ৫ ঘণ্টা। সেই কারণেই সে সময় ভারতের ভায়াকম১৮ (বর্তমানে রিলায়েন্সের অধীনে থাকা জিওসিনেমা প্ল্যাটফর্ম) ৬ কোটি ডলারে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল এবং বিনামূল্যে ম্যাচ দেখিয়েছিল। ফলে প্ল্যাটফর্মটির দর্শক সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। তবে সেখানেও বিজ্ঞাপন আয় ছিল কম- প্রায় ৩ কোটি ডলার। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দেখেছে। ভারতে মূলত সাবস্ক্রিপশন নয়, বিজ্ঞাপনই মিডিয়ার আয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় এই মডেল টেকসই হয়নি।

ভারত ও চীনের বাজার পরিস্থিতি

এই অভিজ্ঞতার পর ফিফা ২০২৬ ও ২০৩০ বিশ্বকাপ মিলিয়ে ভারতীয় বাজারের জন্য প্রায় ১০ কোটি ডলারের একটি প্যাকেজ চেয়েছিল। কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী, জিওস্টার ও সনির দুই বড় প্রতিদ্বন্দ্বীই সেই দামে আগ্রহ দেখায়নি। বরং জিওস্টার মাত্র ২ কোটি ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের পার্থক্য ছাড়াও বড় কারণ হলো ভারতীয় ক্রিকেটের আধিপত্য, বিশেষ করে আইপিএলের জন্য বিপুল বিনিয়োগ। একই সময়ে নারীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও থাকায় দর্শক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ সেদিকেই বেশি।

চীনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই। সেখানকার সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের কেন্দ্র। তবে ফিফার প্রত্যাশা অনুযায়ী চীনা বাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আসেনি। ফিফা শুরুতে ২৫ কোটি ডলার চাইলেও চীনা পক্ষের আগ্রহ ছিল অনেক কম। প্রস্তাব নেমে আসে ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। ফলে সব দিক দিয়ে এখন অর্থই অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সবাইকে বিশ্বকাপ দেখাতে হলে ফিফাকে বড় ধরনের মূল্য ছাড় দিতে হবে।