আফ্রিকা মহাদেশের সেরা ফুটবলার ভিক্টর ওসিমেনের জীবন কাহিনী শুনলে চোখে পানি চলে আসে। তার বেড়ে ওঠা নাইজেরিয়ার লাগোস শহরের ওলোসোসুন এলাকায়, যেখানে বিশ্বের অন্যতম বড় ময়লার ভাগাড় অবস্থিত। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টন ময়লা ফেলা হয়, যার মধ্যে থাকে কেমিক্যাল বর্জ্য, ভাঙা টিভি এবং আরও নানা কিছু। এই ভাগাড়ই ছিল ওসিমেনের খেলার মাঠ।
শৈশবের কষ্ট
ওসিমেনের বয়স যখন মাত্র ২ বা ৩ বছর, তখন তার মা মারা যান। তার বাবা একজন ড্রাইভার ছিলেন, কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর চাকরি হারিয়ে পুলিশ বিভাগের রান্নাঘরে হাঁড়িপাতিল ধোয়ার কাজ শুরু করেন। ওসিমেন এবং তার ছয় ভাইবোন এক রুমের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতেন। বাসাভাড়া দেওয়ার জন্য বাবার আয় যথেষ্ট ছিল না। ওসিমেনের বয়স যখন ১২, তখন বাড়ির মালিক বিদ্যুৎ–লাইন কেটে দেয়। সাতজন এক রুমের মধ্যে অন্ধকারে বসে ছিলেন। ওসিমেন বাইরে গিয়ে ময়লার ভাগাড়ের পাশে বসে কান্না শুরু করে দেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'একজন শিশুর জন্য এটা কেমন জীবন?'
ফুটবল জুতা কুড়ানো
ওসিমেন যখন ফুটবল খেলা শুরু করেন, তখন তার জুতা লাগত। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাড়ে গিয়ে জুতা খুঁজতেন। একদিন তিনি একটি ছেঁড়া নাইকি জুতা পান, যা ছিল বাঁ পায়ের এবং সাইজ ৮। আরেকদিন পেয়েছিলেন একটি পুমা জুতা, ডান পায়ের এবং সাইজ ৯। সেই দিনগুলো ছিল সৌভাগ্যের দিন, কারণ তখন তাদের কাছে এক জোড়া জুতা থাকত এবং সবাই তা পরতে পারত।
কাজের তাগিদে ফুটবল থেকে দূরে
পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ওসিমেনকে ফুটবল খেলা ছেড়ে দিতে হয়। তার বোনেরা রাস্তায় কমলালেবু বিক্রি করত। ওসিমেন ভালো দৌড়াতে পারতেন বলে ট্রাফিক সিগন্যালে পানির বোতল বিক্রি করতেন। তার বড় ভাই আন্দ্রে ভোর ৩টায় ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় সংবাদপত্র বিক্রি করত। মাঝেমধ্যে আন্দ্রে বাড়িতে পত্রিকা নিয়ে আসতেন, যার কাভারে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং দ্রগবাদের ছবি দেখে ওসিমেন মুগ্ধ হতেন। তিনি মনে করতেন, তারা অন্য একটি বিশ্বে বাস করেন।
পারিবারিক কুইজ শো
কোথাও টাকা কামানোর সুযোগ পেলে ওসিমেন চলে যেতেন। একবার একটি টিভি শোতে পারিবারিক কুইজ শোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। শোয়ের শেষ দিকে দর্শক সারি থেকে কয়েকজনকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। ওসিমেনকে ডাকা হয় এবং তিনি খুব ভালো করেন। সেদিন কুইজে অংশ নিয়ে ১০ হাজার নাইরা (প্রায় ৮০০ টাকা) জিতে নেন। তখন পর্যন্ত এটাই ছিল তার উপার্জন করা সবচেয়ে বেশি অর্থ।
চার্চে কাজ ও ফুটবল ট্রায়াল
কয়েক বছর লাগোসের এক পাদরির জন্য কাজ করেন ওসিমেন। চার্চে একটি ল্যাপটপ ছিল, যার মাধ্যমে তিনি লোকজনকে ই-মেইল নিউজ লেটার পাঠানোর অনুমতি দিতে রাজি করাতেন। প্রতি ১০টি ই-মেইলের জন্য ১০ সেন্ট পেতেন। কিছুদিন পর পদোন্নতি হয় এবং তিনি রাস্তায় পাদরির বাইবেল স্টাডি বই বিক্রি শুরু করেন। সহপাঠীরা তাকে রাস্তায় দেখলে হাসাহাসি করত। যা আয় করতেন, সব ভাইবোনকে দিতেন খাবার কিনতে এবং বাসাভাড়া দিতে। বেশির ভাগ রাত চার্চেই ঘুমাতেন। প্রায় দুই বছর শুধু চার্চের দলের সঙ্গেই ফুটবল খেলেছেন।
প্রথম ট্রায়াল
বয়স যখন ১৫, একদিন বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় একজন জানায় যে সুপার ইগলসরা আগামী সপ্তাহে ট্রায়াল নিতে লাগোসে আসছে। ওসিমেন বাসে করে ৯০ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্টেডিয়ামে যান। সেখানে প্রায় ৩০০ ছেলে ছিল। কোচ সবাইকে দৌড়াতে বলেন এবং ধীরগতিরদের বাদ দিয়ে দেন। ওসিমেন প্রাণপণে দৌড়ান। দিনের শেষে তাকে বলা হয়, 'কাল আবার এসো।' পরের দিনও একইভাবে দৌড়ান। মাসখানেক এভাবে চলে। শেষে বল নিয়ে খেলার সুযোগ পান এবং দুর্দান্ত খেলেন। তিন মাস পর ৩০ জনের মধ্যে চূড়ান্ত ট্রায়ালে ২৭ জনকে সিলেক্ট করা হয়। ওসিমেন ছিলেন বাদ পড়া ৩ জনের একজন। কোচ টেকনিক্যাল কারণে বাদ দেওয়ার কথা জানান। সেদিন বাসে করে বাড়ি ফেরার পথে অনেক কান্না করেছিলেন।
আবুজায় ট্রায়াল
কিছু মাস পর আবার সুযোগ আসে। জাতীয় দল দুই সপ্তাহের মধ্যে লাগোসে আসছে শুনে ওসিমেন প্রস্তুত হন। দিনটি এসে গেলে তিনি কাজ থেকে দৌড়ে বাস ধরেন এবং স্টেডিয়ামে যান। সেখানে ৬০০ ছেলে। কোচ ইমানুয়েল আমুনি মাইক্রোফোনে বলেন, 'আজ আমি তোমাদের সবাইকে দেখতে পারব না। আমরা দুই সপ্তাহ পর আবুজা যাব। যদি মনে করো যে তুমি ভালো, তাহলে আবুজা এসো এবং আমার সঙ্গে দেখা করো।' আবুজা যেতে ৯ ঘণ্টার রাস্তা। ওসিমেনের কোনো গাড়ি ছিল না। পাড়ার একজন এজেন্টকে বললে তিনি গাড়ির ব্যবস্থা করেন। ওসিমেন খুব নার্ভাস ছিলেন এবং প্রথমে যেতে চাননি, কিন্তু বাবা তাকে যেতে বলেন। পুরোনো একটি গাড়িতে আবুজার দিকে রওনা হন এবং মধ্যরাতে পৌঁছান।
১৫ মিনিটের সুযোগ
পরের দিন সকালে স্টেডিয়ামের বাইরে ৯০০ জনের মতো অপেক্ষা করছিল। প্রথম দিন মাঠেই নামার সুযোগ পাননি। দ্বিতীয় দিন একজন কোচ তার দিকে আঙুল তুলে বলেন, 'সবুজ শার্ট, তোমার কাছে ১৫ মিনিট আছে।' ওসিমেন জানতেন যে তাদের মুগ্ধ করার একমাত্র উপায় হলো দৌড়ানো। তাই তিনি প্রচণ্ড জোরে দৌড়ান এবং ১৫ মিনিটে ২ গোল করেন। কিন্তু কোচেরা যে কয়জনের নাম বললেন, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন না। পার্কিং লটের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। গাড়িতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে পেছন থেকে লোকজন চিৎকার করে বলে, 'এই! সবুজ শার্টের ছেলেটা!' তারা জানায়, কোচ তাকে দেখতে চান। টিম ডাক্তার তাকে চিনতে পেরেছিলেন। ডাক্তার যদি সেটা না করতেন, তাহলে আজ ওসিমেন ফুটবলার হতেন না।
অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ জয়
একের পর এক ট্রায়াল চলতে থাকে। যারা টিকতেন তারা দলের সঙ্গে হোটেলে থাকতেন। ওসিমেন এজেন্টের ভাইয়ের বাড়িতে থাকতেন এবং তাদের সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া ও ঘরদোর পরিষ্কারে সাহায্য করতেন। একদিন তার স্ত্রী রান্না করার সময় জানতে পারেন যে ওসিমেন ভাবতেন টেবিলের খাবার আগের দিনের বেচে যাওয়া খাবার। তিনি তাকে বুঝিয়ে দেন যে খাবার তার জন্যই। একদিন সত্যিই দলে সুযোগ পেয়ে যান। পরের বছর চিলিতে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে খেলতে যান এবং ৭ ম্যাচে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেন। নাইজেরিয়া বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পর কিছু টাকা পেয়ে তিনি বোনদের কল করে জানান যে তাদের সবাইকে এক-রুমের বাড়ি থেকে দুই-রুমের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
পেশাদার ক্যারিয়ার ও বাবার মৃত্যু
কয়েক বছর পর উলফসবার্গের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং অনেক বেশি টাকা পান। তিনি ফোনে ব্যাংকের অ্যাপ বারবার রিফ্রেশ করে চেক করছিলেন! অথচ দুই বছর আগেও তিনি ১০ সেন্টের পানির বোতল বিক্রি করতেন। ভালো দিনে হয়তো ২ ডলার আয় হতো। তিনি বাবাকে কল করে বলেন, 'আপনাকে আর বাড়ির মালিকের ভাড়ার কথা চিন্তা করতে হবে না। আমি আপনাকেই বাড়ির মালিক বানাচ্ছি।' বাবার জন্য একটি গাড়ি এবং ড্রাইভারও ঠিক করে দেন। উলফসবার্গ থেকে ফ্রান্সের লিল-এ চলে যান। এরপর কোভিড শুরু হলে বাবা হাসপাতালে ভর্তি হন। ওসিমেন ফ্রান্সে একা আটকে ছিলেন। তিনি নাইজেরিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রাইভেট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু ক্লাব কর্তৃপক্ষ ট্রান্সফার নিয়ে আলোচনা করছিল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে খটকা লাগে। ফোনে দেখেন বাড়ি থেকে ২০টি মিসড কল। ফেসটাইমে ভাইকে কল করে জানতে পারেন, বাবা আর নেই। এই খবর শোনার পর তিনি ফোন ছুড়ে মারেন এবং ঘরের জিনিসপত্র ভাঙতে থাকেন। প্রতিবেশীরা এসে তাকে শান্ত করে। বাবার শেষকৃত্যের জন্য দেশে ফিরে তিনি ফুটবল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন।
নাপোলিতে পুনর্জন্ম
নাপোলিতে এসে নিজেকে আবার খুঁজে পান। কোচ তাকে বাবার মতো স্নেহ করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে তিনি বিশ্বের সেরা হতে পারেন। ওসিমেন এখন অনুপ্রেরণা হতে চান সেই সব শিশুদের জন্য, যারা তার মতো বেড়ে উঠছে। যারা পরের বেলা কী খাবে, সেটার জন্য কাজ করে, ট্রাফিকে পানি বিক্রি করে, ময়লার স্তূপে কিছু পাওয়ার আশায় খোঁড়াখুঁড়ি করে। জীবনযুদ্ধ করে। স্বপ্ন দেখে। প্রার্থনা করে।



