২০২৬ বিশ্বকাপ: উত্তর আমেরিকায় বসছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ
উত্তর আমেরিকায় বসছে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাযজ্ঞ

২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর বসছে উত্তর আমেরিকার মাটিতে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে এই মহাযজ্ঞ। আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের মাধ্যমে শুরু হবে বিশ্বকাপ ২০২৬। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেটিকে টুর্নামেন্ট চলাকালে ‘New York New Jersey Stadium’ নামে ডাকা হবে।

কানাডার বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা

কানাডা এবার বিশ্বকাপে খেলছে। তারা আয়োজক দেশগুলোর একটি হওয়ায় সরাসরি জায়গা পেয়েছে। কানাডায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এবারের বিশ্বকাপের আবেগ একটু আলাদা। টরন্টোর বিএমও ফিল্ড ও ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেসে ম্যাচ হবে। কানাডার ফুটবলপ্রেমীরা তাই নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেক আগে থেকেই। যদিও মন্ট্রিয়ল আয়োজক শহরের তালিকায় নেই, তবু এই শহরও এখন ফুটবল উন্মাদনায় ভাসছে।

কানাডার প্রস্তুতি ও দল

কানাডার দুই আয়োজক শহর টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। দুই শহরই অবকাঠামোগতভাবে প্রস্তুত। এখন মূলত শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশনাল দিকগুলো যাচাই করা হচ্ছে। টরন্টো ৬টি ম্যাচ আয়োজন করবে, এতে কানাডার উদ্বোধনী ম্যাচও রয়েছে। ভ্যাঙ্কুভারে ৭টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে কানাডার দুটি গ্রুপ ম্যাচও রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কানাডা ফুটবলে গত কয়েক বছরে বেশ উন্নতি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপে খেলা কিছু তারকা ফুটবলার কানাডার ফুটবলের চেহারাই বদলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় নাম আলফানসো ডেভিস, বায়ার্ন মিউনিখের এই দ্রুতগতির লেফট-ব্যাক এখন বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত মুখ। এ ছাড়া জোনাথন ডেভিস ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত গোল করছেন। আরও আছে টাজন বুকানন, স্টিফেনের মতো খেলোয়াড়। বর্তমানে কানাডার র‍্যাঙ্কিং প্রায় ২৭–৩০ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অবস্থান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে বাস্তবতা হলো কানাডা এখনো ‘উঠতি শক্তি’ বা ইমার্জিং টিম হিসেবে বিবেচিত। শক্তি আছে, গতি আছে, তরুণ প্রতিভাও আছে। কিন্তু বিশ্বকাপের যথাযোগ্য অভিজ্ঞতা কম। কানাডা এর আগে মাত্র দুবার বিশ্বকাপে খেলেছে—১৯৮৬ ও ২০২২ সালে। ২০২৬ হবে তাদের টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এবং নিজেদের মাটিতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কানাডায় এর আগে কখনো পুরুষদের বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়নি। এবারই প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। তবে ২০১৫ সালে ফিফা উইমেনস ওয়াল্ড কাপের আয়োজন করেছিল কানাডা।

বিশ্বকাপের নতুন দিগন্ত

কানাডার জন্য এটি শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং জাতীয় গর্বের বিষয়ও। আইস হকির দেশ হিসেবে পরিচিতির দেশটি এখন ফুটবল বা সকারের বিশ্বমঞ্চেও নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দিচ্ছে। দুই শহরে বিশ্বকাপ ম্যাচ হওয়ায় পুরো দেশেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। বলা বাহুল্য, বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। জার্সি আর পতাকায় দলে দলে সমর্থক গোষ্ঠীর প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। এখানেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা আড্ডায়, অনুষ্ঠানে, পার্টিতে, কফি শপে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ইত্যাদি নিয়ে তর্ক বিতর্কে মশগুল। অনেকে মাঠে সরাসরি খেলা দেখতে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে টিকিটও সংগ্রহ করেছেন।

এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ, ম্যাচ হবে মোট ১০৪টি। ১৬টি শহরে ছড়িয়ে পড়বে এই উৎসব। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি শহর, কানাডার ২টি এবং মেক্সিকোর ৩টি শহর ভেন্যু হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ফিফা সম্প্রতি বিশ্বকাপের কিছু নিয়ম পরিবর্তন করেছে। গ্রুপ পর্ব শেষে এবং কোয়ার্টার-ফাইনালের পর হলুদ কার্ডের হিসাব রিসেট করা হবে, যাতে খেলোয়াড়েরা আগের ম্যাচের হলুদ কার্ডের কারণে সেমিফাইনাল বা ফাইনাল মিস না করেন। ৪৮ দলের এই প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য পুরস্কার অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। মোট আর্থিক বণ্টন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

টিকিট ও ভাষার ব্যবহার

এদিকে টিকিট নিয়ে উত্তেজনাও তুঙ্গে। বিশ্বকাপ টিকিটের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে অনেক ম্যাচের টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে বা দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকিটের জন্য কয়েক শ মিলিয়ন আবেদন জমা পড়েছে। বিশেষ করে ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের দাম নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে।

এবারের আরেকটি মজার দিক হলো ভাষার ব্যবহার। ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা কিংবা এশিয়ায় যাকে ‘ফুটবল’ বলা হয়, আমেরিকায় সেটিই পরিচিত ‘সকার’ নামে। কারণ, এখানে ফুটবল বলতে সাধারণত ন্যাশনাল ফুটবল লিগের খেলাকে বোঝানো হয়। তবে বিশ্বকাপের সময় আমেরিকাতেও ওয়াল্ড কাপ এবং ফুটবল শব্দ দুটোই ব্যাপকভাবে শোনা যাবে। যদিও স্থানীয় মিডিয়ার বড় অংশ এখনো সকার শব্দটিই ব্যবহার করছে।

ঐতিহাসিক সহ-আয়োজক

আরেকটি ঐতিহাসিক বিষয় হলো, ২০২৬ হবে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম আসর যা তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে: কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। অবশ্য এর আগে দুই দেশ মিলে বিশ্বকাপ আয়োজন হয়েছিল। ২০০২ সালে যৌথভাবে আয়োজন করেছিল জাপান এবং কোরিয়া। সেটিই ছিল প্রথম সহ-আয়োজিত বিশ্বকাপ। মেক্সিকো এবার একটি বিশেষ রেকর্ড গড়ছে। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর ২০২৬–এ তারা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করছে—যা আর কোনো দেশ এই গৌরবের অংশ হতে পারেনি।

বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়—এটি সংস্কৃতি, আবেগ, অর্থনীতি আর বৈশ্বিক মিলনের এক অনন্য আয়োজন। আর এবার সেই উৎসবের বড় অংশ জুড়ে থাকবে উত্তর আমেরিকা। সংগত কারণেই আমেরিকা, মেক্সিকোর মতো কানাডায় মন্ট্রিয়লের ক্যাফে, টরন্টোর ডাউনটাউন, ভ্যাঙ্কুভারের পাব সবখানেই এবার বেশি আলোচনা, উত্তেজনা বিশ্বকাপ নিয়ে। খেলা শুরুর দিন যত এগোচ্ছে ক্রমেই বাড়ছে সেই আবেগ। কেমন জমবে খেলা, কারই–বা হাতে উঠবে জয়ের ট্রফি, হিসাব কষছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা।