যুদ্ধের ছায়ায় ১৯৩৮ বিশ্বকাপ: ইতালির দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের গল্প
যুদ্ধের ছায়ায় ১৯৩৮ বিশ্বকাপ: ইতালির দ্বিতীয় শিরোপা

১৯৩৮ সালে তৃতীয় ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। এই বিশ্বকাপ ছিল ইতালির জন্য ঐতিহাসিক, কারণ তারা টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতেছিল। তবে এই বিশ্বকাপের পটভূমি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিপূর্ণ।

যুদ্ধের পূর্বাভাস

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইউরোপের বুকে যুদ্ধের কালো মেঘ জমে উঠেছিল। অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে দখল করে নেয় 'আনশলুস' এর মাধ্যমে। জার্মানি অস্ট্রিয়ার সেরা খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অন্যদিকে স্পেন গৃহযুদ্ধে জ্বলছিল। দক্ষিণ আমেরিকায় পেশাদার ফুটবল নিয়ে অস্থিরতা চলছিল। উরুগুয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তারা ইউরোপে খেলতে যাবে না, এবং আর্জেন্টিনাও তাদের পাশে দাঁড়ায়।

আর্জেন্টিনার ক্ষোভ

আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশন ক্ষুব্ধ ছিল। ১৯৩৬ সালে বার্লিনের অপেরা ক্রলে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে তৃতীয় বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব আর্জেন্টিনাকে দেওয়ার কথা উঠেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফরাসি কূটচালে তা সম্ভব হয়নি। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বুয়েনস আইরেসের ফুটবল ফেডারেশনের অফিসের বাইরে দাঙ্গা বেধে যায়, যা পুলিশের হস্তক্ষেপে শান্ত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতালির শক্তিশালী দল

ইতালি দলে বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৩৪ সালের দুই ইনসাইড ফরওয়ার্ড মিজ্জা ও ফেরারি এখনও ছিলেন, কিন্তু নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়ে উঠছিল এক দুর্ধর্ষ শক্তি। সবার উপরে ছিলেন লম্বা, সুঠাম ও বিস্ফোরক সেন্টার ফরওয়ার্ড সিলভিও পিওলা। শক্তি, গতি ও নৈপুণ্যের দুর্লভ মিশ্রণে তিনি মাঠে ঝড় তুলতেন। ১৯৩৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকেই তিনি গোলের বন্যা বইয়ে দেন। বিখ্যাত উলভস ম্যানেজার মেজর ফ্রাঙ্ক বাকলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে পিওলা খুব দ্রুত ইউরোপের সেরা সেন্টার ফরওয়ার্ড হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতালির গোলপোস্টে ছিলেন দুর্ভেদ্য আলদো ওলিভেরি। রক্ষণে ছিলেন ফনি ও রাভা। মিডফিল্ডে লোকাটেলি। উইংয়ে দুরন্ত গতি নিয়ে এসেছিলেন আমেদেও বিয়াভাতি ও জিনো কলৌসি। ১৯৩৫ সালের পর 'আজুরি' মাত্র একবার হেরেছিল। কোচ ভিট্টোরিও পোজো লিখেছিলেন যে ১৯৩৮ সালের দল ছিল অসাধারণ সমন্বিত এবং তাদের বোঝাপড়া ও নমনীয়তা ছিল অনন্য।

প্রতিদ্বন্দ্বী দলসমূহ

অস্ট্রিয়া তখন আর নেই। ইংল্যান্ড অংশ নেয়নি। ফলে হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়াকে ইতালির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধরা হচ্ছিল। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে ইতালি আবারও ট্রফি জিতবে। তবে সবার নজর কেড়েছিল ব্রাজিল। প্রতিভায় টগবগে এক দল নিয়ে তারা এসেছিল। সামনে ছিলেন কিংবদন্তি লিওনিডাস, যার বাইসাইকেল কিক, গতি ও গোল করার ক্ষমতা ইউরোপকে হতবাক করে দেয়। তার পাশে ছিলেন দুর্ভেদ্য ফুলব্যাক ডোমিঙ্গোস ডা গাইয়া ও ডাক্তার-ফুটবলার ডাঃ নারিজ।

হাঙ্গেরির হয়ে খেলছিলেন বিস্ময়কর জর্জ সারোশি এবং তার পাশে তরুণ প্রতিভা সেঞ্জেলার। সেঞ্জেলারের বাজারদর তখন চার লাখ লিরারও বেশি ছিল, কিন্তু তিনি বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। অন্যদিকে জার্মানি দলে নতুন কোচ হিসেবে এসেছিলেন শেপ হারবার্গার, যার কাজ ছিল ছিন্নভিন্ন জার্মান-অস্ট্রিয়ান দলকে এক সুতোয় বাঁধা।

প্রথম রাউন্ডের উত্তেজনা

প্রথম রাউন্ডে মার্সাইয়ে ইতালির সামনে দাঁড়ায় নরওয়ে। ম্যাচের আগে ফ্যাসিবাদবিরোধী দর্শকদের বিদ্রূপে স্টেডিয়াম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পোজো খেলোয়াড়দের বলেন, চিৎকার থামা পর্যন্ত স্যালুট ধরে রাখো। মাঠে নরওয়ে ছিল ভয়ংকর। বিশেষ করে সেন্টার ফরওয়ার্ড ব্রুনিল্ডসেন ইতালির রক্ষণ কাঁপিয়ে দেন। কিন্তু গোলকিপার ওলিভেরির অসাধারণ সেভ ইতালিকে বাঁচায়। নির্ধারিত সময়ে ১-১ হয়। অতিরিক্ত সময়ে পিওলার গোলে ২-১ জিতে কোনোমতে বেঁচে যায় ইতালি।

এদিকে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচ হয়ে ওঠে রুদ্ধশ্বাস নাটক। অতিরিক্ত সময়সহ ম্যাচে হয় ১১ গোল। লিওনিডাস করেন চার গোল, পোল্যান্ডের উইলিমোস্কিও করেন চার গোল। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল জেতে। জার্মানির বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ড চমক দেখায়। রিপ্লেতে সুইসরা ৪-২ গোলে জিতে যায়।

কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল

কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি মুখোমুখি হয় স্বাগতিক ফ্রান্সের। ৮৫ হাজার দর্শকে ঠাসা কলম্বাস স্টেডিয়ামে শুরু হয় মহারণ। পিওলার দুরন্ত নৈপুণ্যে ইতালি ৩-১ গোলে জিতে যায়। ম্যাচ শেষে পোজো বলেন, 'আমি যাদুকর নই। শুধু তাদের পথ দেখিয়েছি।' অন্যদিকে ব্রাজিল-চেকোস্লোভাকিয়া ম্যাচ রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। লাথি, সংঘর্ষ, বহিষ্কার—সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি। আহত হন লিওনিডাস, নেজলি, প্লানিকা ও আরও অনেকে। রিপ্লেতে ব্রাজিল জিতে সেমিফাইনালে ওঠে।

সেমিফাইনালের আগে পোজো মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলেন। তিনি ব্রাজিল শিবিরে গিয়ে বলেন, 'হারলে কিন্তু আবার বোরদেও ফিরতে হবে।' ব্রাজিলিয়ানরা আত্মবিশ্বাসে বলে, 'আমরাই জিতব।' কিন্তু মার্সাইয়ে ইতালির সামনে ভেঙে পড়ে ব্রাজিল। পিওলার চাপে রক্ষণ ভাঙতে থাকে। ডোমিঙ্গোস ডা গাইয়া পেনাল্টি ফাউল করলে মিজ্জা গোল করেন। শেষ পর্যন্ত ইতালি ২-১ জিতে ফাইনালে ওঠে। অন্য সেমিফাইনালে হাঙ্গেরি ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে সুইডেনকে। সেঞ্জেলার ও সারোশির আক্রমণে সুইডিশ রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

ফাইনালের নাটকীয়তা

ফাইনালের আগে ইতালির শিবিরে অদ্ভুত চাপ বিরাজ করছিল। পোজোর হাতে তখন একটি টেলিগ্রাম ছিল, এক খেলোয়াড়ের বাবার মৃত্যুসংবাদ। কিন্তু তিনি ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা কাউকে জানাননি। ফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ হাঙ্গেরি। ম্যাচ শুরুর ছয় মিনিট পর ইতালির আক্রমণ জ্বলে ওঠে। বিয়াভাতি বল বাড়ান মিজ্জাকে, সেখান থেকে কলৌসি গোল করে ইতালিকে এগিয়ে দেন। এক মিনিট পরই টিটকস সমতা ফেরান। কিন্তু এরপর ইতালির দাপট শুরু হয়। মিজ্জা, ফেরারি, পিওলা ও কলৌসির অসাধারণ সমন্বয়ে হাঙ্গেরির রক্ষণ ভেঙে পড়ে। পিওলা করেন দুর্দান্ত গোল। কলৌসি নিজের দ্বিতীয় গোলও পান। হাঙ্গেরি লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত ইতালি ৪-২ গোলে জিতে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগে ভেঙে পড়েন মিজ্জা। কেউ কাঁদছেন, কেউ আলিঙ্গনে ডুবে যাচ্ছেন। পোজো এতটাই আবেগে হারিয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি খেয়ালই করেননি, ট্রেনারের বালতির পানি তার জুতোর ভেতর ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের অন্ধকার

তারপর পৃথিবী ডুবে যায় যুদ্ধের অন্ধকারে। বিশ্বকাপ থেমে যায় দীর্ঘ এক যুগ। আবার ফুটবলের মহোৎসব ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না, এটি ছিল ইতিহাসের এক অধ্যায়, যেখানে ফুটবল ও রাজনীতি একাকার হয়ে গিয়েছিল।