১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে বিশ্বকাপ ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের সূচনা হয়েছিল তারও ৫৮ বছর আগে, ১৮৭২ সালে। সেই বছর গ্লাসগোতে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড।
স্বপ্নের শুরু ফ্রান্সে
বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বপ্ন প্রথম জন্ম নেয় ফ্রান্সে। এই মহাযজ্ঞের পেছনে ছিলেন দুই ফরাসি ফুটবল সংগঠক জুলে রিমে এবং হেনরি দেলনে। জুলে রিমের নামেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্রাজিল সেই সোনার ট্রফি চিরদিনের জন্য নিজেদের করে নেয়।
জুলে রিমে ১৯১৯ সালে ফ্রেঞ্চ ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ১৯২০ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ফিফার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে হেনরি দেলনে ১৯০৮ সাল থেকেই ফরাসি ফুটবল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯১৯ থেকে ১৯৫৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফেডারেশনের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ৮০ বছর বয়সে রিমেও তার কিছুদিন পর মৃত্যুবরণ করেন।
রিমে ও দেলনে দু’জনই ছিলেন ফুটবলের উন্মত্ত প্রেমিক। ফুটবল বিস্তার ও পরিচালনার নানা পথ নিয়ে মাঝে মাঝে তাদের মতবিরোধ হলেও তা ছিল সাময়িক। পরে হিসাব করে দেখা যায়, ফরাসি ফুটবল, ইউরোপীয় ফুটবল এবং বিশ্বকাপের ভিত গড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল এই দুই মানুষের।
ফিফার প্রথম সভা ও বিশ্বকাপের পথে
১৯০৪ সালে প্যারিসে ফিফার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত না থাকলেও সিদ্ধান্ত হয়, আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের একমাত্র অধিকার থাকবে ফিফার হাতে। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজন বাস্তবে রূপ নিতে সময় লাগে আরও ২৬ বছর।
১৯২০ সালে অ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিকের সময় ফিফার কংগ্রেস বসে। বিশ্বকাপ নিয়ে এতদিনের আলোচনা তখন বাস্তবতার দিকে এগোতে শুরু করে। ১৯২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকের সময় আবারও বিশ্ব ফুটবল নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ওঠে এবং উরুগুয়েতে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব সমর্থন পায়।
দুই বছর পর ফিফা কংগ্রেস ঘোষণা করে, ‘আন্তর্জাতিক ফুটবল আর অলিম্পিকের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না।’ কারণ তখন অনেক দেশেই পেশাদার ফুটবল চালু হয়ে গেছে, অথচ অলিম্পিকে পেশাদার খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না।
১৯২৮ সালের মন্টেভিডিও অলিম্পিক শেষে আর্জেন্টিনার সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ের পর উরুগুয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর জুলে রিমে ঘোষণা দেন, আর দেরি নয়, বিশ্বকাপ আয়োজন করতেই হবে।
আয়োজক নির্বাচন ও উরুগুয়ের সাহসী প্রস্তাব
এরপর শুরু হয় আয়োজক দেশ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক। আয়োজক হতে চেয়েছিল ইতালি, হল্যান্ড, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং সর্বশেষে উরুগুয়ে। ছোট দেশ উরুগুয়ে সাহসী প্রস্তাব দেয়, তারা সব দলের যাতায়াত খরচ বহন করবে, হোটেল খরচ নেবে না এবং নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করবে। মন্টেভিডিওতে নির্মিত সেই স্টেডিয়ামের নাম হবে ‘শতবার্ষিকী স্টেডিয়াম’, কারণ ১৯৩০ সালে দেশটির স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তি।
উরুগুয়ের এই উদার প্রস্তাবে ইউরোপের দেশগুলো আর আপত্তি করতে পারল না। ১৯২৯ সালের বার্সেলোনা কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় উরুগুয়েকে।
অংশগ্রহণে অনাগ্রহ ও শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ
তবে প্রতিযোগিতা শুরুর দুই মাস আগেও ইউরোপের অনেক দেশ অংশগ্রহণে অনাগ্রহ দেখায়। সুইডেন, জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। ব্রিটেন তখন ফিফার বাইরেই ছিল। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স, রোমানিয়া, যুগোস্লাভিয়া এবং বেলজিয়াম অংশগ্রহণে রাজি হয়।
রোমানিয়াকে খেলতে রাজি করান দেশটির রাজা ক্যারল নিজে। তিনি জাতীয় দলের দায়িত্বও নিজের হাতে তুলে নেন। অন্যদিকে বেলজিয়ামের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন ফিফার সহ-সভাপতি রডলফ সিলড্রেয়ার্স।
শেষ পর্যন্ত ১৩টি দেশ অংশ নেয় প্রথম বিশ্বকাপে। চারটি গ্রুপ থেকে সেমিফাইনালে ওঠার নিয়ম করা হয়।
- ১ নম্বর গ্রুপে ছিল চিলি, মেক্সিকো, ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা।
- ২ নম্বর গ্রুপে ছিল বলিভিয়া, ব্রাজিল ও যুগোস্লাভিয়া।
- ৩ নম্বর গ্রুপে ছিল পেরু, উরুগুয়ে ও রোমানিয়া।
- ৪ নম্বর গ্রুপে ছিল প্যারাগুয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম।
উরুগুয়ের প্রস্তুতি ও ফেভারিট
উরুগুয়েকেই তখন সবচেয়ে বড় ফেভারিট ধরা হচ্ছিল। ১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিকজয়ী দলের কয়েকজন তারকা তখনও ছিলেন দলে। অধিনায়ক হোসে নাসাজি, উইং হাফ হোসে আন্দ্রাদে এবং গোলমুখে দুর্দান্ত হেক্টর স্কারোনে ছিলেন দলের বড় ভরসা।
খেলোয়াড়দের মন্টেভিডিওর বাইরে কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখা হয়েছিল। একবার গোলকিপার মাজালি অনুমতি ছাড়া বাইরে বের হতে গিয়ে ধরা পড়েন। পরদিনই তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং রিজার্ভ গোলকিপার এনরিকে ব্যালেস্টেরোস সুযোগ পান।
শতবার্ষিকী স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় প্রাথমিক ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় পার্ক সেন্ট্রাল এবং অন্যান্য মাঠে।
প্রথম ম্যাচ ও গ্রুপ পর্বের উত্তেজনা
১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই, রবিবার, প্রথম বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্স ৪-১ গোলে হারায় মেক্সিকোকে। ফরাসি দলের লরেন্ট ম্যাচে পাঁজর ভেঙে মাঠ ছাড়েন। অধিনায়ক গ্যাস্টন বাইয়েন, রাইট হাফ শাল্লে ভিগনাল এবং রাইট ব্যাক এতিয়েন ম্যাটলার দুর্দান্ত খেলেন।
দুই দিন পর আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হারে ফ্রান্স। ম্যাচ শেষে রেফারির ভুল বাঁশি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। পরে রেফারি নিজের ভুল স্বীকারও করেন।
আর্জেন্টিনার পরের ম্যাচ ছিল মেক্সিকোর বিপক্ষে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার কারণে ম্যানুয়েল ফেরেরা খেলতে পারেননি। তার বদলে সুযোগ পান তরুণ গইইলার্মে স্তাবিল এবং তিনি হ্যাটট্রিক করেন। ম্যাচে বলিভিয়ার রেফারি ইউলিসিস সসেডো পাঁচটি পেনাল্টি দেন।
চিলির বিপক্ষে ম্যাচেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। চিলির টোরেস ও আর্জেন্টিনার মন্টির সংঘর্ষে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ বেঁধে যায়। শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
উরুগুয়ের ম্যাচ ও যুগোস্লাভিয়ার চমক
১৮ জুলাই প্রথমবার মাঠে নামে উরুগুয়ে। পেরুর বিপক্ষে তারা মাত্র ১-০ গোলে জেতে। গোল করেন একহাতবিশিষ্ট ফুটবলার কাস্ত্রো। পরের ম্যাচে রোমানিয়াকে ৪-০ গোলে হারায় তারা।
অন্যদিকে যুগোস্লাভিয়া চমক দেখিয়ে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ব্রাজিলকে। পরে বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা।
ফাইনাল ম্যাচ ও চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে
ফাইনাল ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের দিনরাত পুলিশ পাহারায় রাখা হয়। স্টেডিয়ামের চারপাশে সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল। ম্যাচের আগে দুই দলই নিজেদের দেশের তৈরি বল দিয়ে খেলার দাবি জানায়।
ফাইনালে স্বাগতিক উরুগুয়ের প্রতিপক্ষ ছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ১৩ মিনিটে পাবলো ডোরাডো উরুগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। পরে পিউসেলে সমতা ফেরান। বিরতির আগে স্তাবিল-এর গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। পেড্রো সি স্কোর ২-২ করেন। এরপর তরুণ সান্তোস ইরিয়ার্তে উরুগুয়েকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। শেষ মুহূর্তে কাস্ত্রোর গোল উরুগুয়ের ৪-২ জয়ের সিলমোহর বসায়।
ম্যাচ শেষ হতেই মন্টেভিডিওজুড়ে উল্লাস শুরু হয়। হাজার হাজার গাড়ির হর্ন, জাহাজের ভেঁপু আর পতাকার ঢেউয়ে মুখর হয়ে ওঠে শহর। পরদিন উরুগুয়েতে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
ফরাসি ভাস্কর আবে লাফ্লেয়ার নকশাকৃত ৫০ হাজার ফ্রাঙ্ক মূল্যের সোনার ট্রফি উরুগুয়ের অধিনায়ক হোসে নাসাজির হাতে তুলে দেন জুলে রিমে।
অন্যদিকে বুয়েনস আইরেসে তখন বিক্ষোভ শুরু হয়। উত্তেজিত জনতা উরুগুয়ের কনস্যুলেটে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ফাঁকা গুলিও চালায়।



