সেমিফাইনাল ট্র্যাজেডি ভুলে ২৩তম বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য জার্মানির
সেমিফাইনাল ট্র্যাজেডি ভুলে বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য জার্মানির

সেমিফাইনাল আর ফাইনাল ট্র্যাজেডির দল বলা হয় জার্মানিকে। ফুটবলের যে কোনো আসরে সবসময়ই ফেভারিটের তকমা থাকে তাদের গায়ে। ফাইনাল আর সেমিফাইনালে হারের লম্বা মিছিলে যোগ না দিলে জার্মানদের বিশ্ব ফুটবলের সেরা দল আপনাকে বলতেই হতো। সেক্ষেত্রে ব্রাজিলের আগে তাদের নামটিই উচ্চারণ করতে হতো। তবে এবার আসন্ন ২৩তম বিশ্বকাপ জিতে সবার সেরা হওয়ার সুযোগ আছে জার্মানদের। এ লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় ইউরোপের পাওয়ার হাউজরা লড়বে বলে জানিয়েছেন দলটির কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান।

গ্রুপ পর্বের চ্যালেঞ্জ

কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারো বিশ্বকাপে 'ই' গ্রুপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ কুরসাও, আইভরিকোস্ট ও ইকুয়েডর। হাউসটনে আগামী ১৪ জুন উঠতি শক্তি কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধারের মিশন শুরু করবে অধিনায়ক জসুয়া কিমিচের দল।

দলের পুনর্গঠন ও শক্তি

বিগত কয়েক বছরের ব্যর্থতা ঘুচিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হওয়ার পথে আছে জার্মানি। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর দলটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন কোচ নাগেলসম্যান তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সংমিশ্রণে একটি আক্রমণাত্মক এবং দ্রুতগতির দল গড়েছেন। দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ মিডফিল্ড ও আক্রমণ ভাগ। বিশেষ করে জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান উইর্টজ, জসুয়া কিমিচ, কাই হার্ভাটেজ এই মুহূর্তে জার্মানির আশা-ভরসার প্রতীক। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মুসিয়ালা ও উইর্টজের জুটি বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড জুটি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স

জার্মানি ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও দারুণ খেলেছে। তারা নিজেদের গ্রুপে শীর্ষে থেকে সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ম্যাচ জিতেছে বিশাল ব্যবধানে। বিশেষ করে স্লোভাকিয়াকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা তাদের শক্তির জানান দিয়েছে।

লক্ষ্য ও সম্ভাবনা

এবারের বিশ্বকাপে জার্মানির প্রথম লক্ষ্য অন্ততপক্ষে সেমিফাইনাল খেলা নিশ্চিত করা। সেটি করতে পারলে তারা সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে স্পর্শ করতে চাইবে। ২০১৪ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জয় করা জার্মানি এবার সফল হলে রেকর্ড ও পরিসংখ্যানে পেলের দেশের অর্জনকে ছাপিয়ে যাবে। বিশ্বফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই জার্মানিকে এবার সম্ভাব্য শিরোপা দাবিদারদের মধ্যে রাখছেন। কারণ দলটির স্কোয়াডে এখন গতি, টেকনিক, তরুণ শক্তি এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বসহ সবকিছুর ভারসাম্য রয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

অবশ্য তাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। রক্ষণভাগে ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকারের অভাব এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলানো এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরপরও বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় জার্মানি এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামার অপেক্ষায়।

ঐতিহ্য ও অতীত সাফল্য

২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ জিতে সাফল্যের বৃত্ত পূরণ করে জার্মানি। কেননা এর আগে বৈশ্বিক সব টুর্নামেন্টের ট্রফি জিতলেও কনফেডারেশন্স কাপই শুধু বাকি ছিল। বর্তমানে জার্মানদের শোকেসে চারটি বিশ্বকাপ (১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪), তিনটি ইউরো ও একটি কনফেডারেশন্স কাপের ট্রফি শোভা পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে চারবার রানার্সআপ (১৯৬৬, ১৯৮২, ১৯৮৬, ২০০২) ও তিনবার তৃতীয় হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোর ইতিহাসে জার্মানিই এককভাবে সর্বোচ্চ তিনবার শিরোপা জয় করেছে (১৯৭২, ১৯৮০, ১৯৯৬)। ইউরোতে সর্বোচ্চ তিনবার রানার্সআপ হওয়ার রেকর্ডও জার্মানদের (১৯৭৬, ১৯৯২, ২০০৮)।

সাফল্যের ধারা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে (১৯৯৬ ইউরো) পাওয়া সাফল্যের পর দীর্ঘ ১৮ বছর বড় কোনো আসরের শিরোপা জয় করতে ব্যর্থ হয় অদম্য জার্মানরা। এ সময়ে কী ইউরো কী বিশ্বকাপ-প্রতিটি আসরেই তীরে এসে তরি ডুবে তাদের। ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার, ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে তৃতীয়। অন্যদিকে ২০০৮ ইউরোর ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হতে হয়। জার্মানরা ধারাবাহিক এই কষ্টের বোঝার অবসান ঘটায় ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে। বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ দেড় যুগ পর বড় আসরের ট্রফি জয়ের উৎসব করে তারা। আর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় দীর্ঘ দুই যুগ পর।

সাফল্যের এ ধারা এর পরও ধরে রাখতে সক্ষম হয় যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এরপর দেশটির যুবারা জিতেছে অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপের শিরোপাও। কিন্তু সবশেষ দুই বিশ্বকাপে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে অদম্য জার্মানি। দুটি আসরেই বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে। এবার ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপে সেই ব্যর্থতা ভুলে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে চান জার্মানরা।