বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের ঐতিহাসিক সাফল্য
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ হলো মালদ্বীপের মালের জাতীয় স্টেডিয়ামে। গত রাতে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে টাইব্রেকারে ভারতকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে বাংলাদেশ টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জিতেছে। ২০২৪ সালের পর ২০২৬ সালেও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এই কৃতিত্ব দলীয় সংহতি ও প্রবাসী ফুটবলার রোনান সুলিভানের অসামান্য অবদানের ফলাফল।
রোনান সুলিভানের উত্থান
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রোনান সুলিভান পুরো টুর্নামেন্টে আলো ছড়িয়েছেন। ১২ নম্বর জার্সি গায়ে থাকলেও মাঠে তিনি খাঁটি ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই দুটি গোল করে দলকে জয় এনে দেন তিনি। একটি দর্শনীয় ফ্রি-কিক এবং অন্যটি নিখুঁত হেডার গোলের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও তাঁর নেওয়া কর্নার থেকে সেন্টার ব্যাক রিয়াদ গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন।
দলের প্রস্তুতি ও সংহতি
বাংলাদেশের এই সাফল্যের পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। গত ২৮ জানুয়ারি যশোরের শামসুল হক একাডেমিতে শুরু হওয়া প্রাথমিক ক্যাম্প চলে ১৪ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত। প্রিমিয়ার লিগের ব্যস্ততায় এক মাসের বিরতির পর ১৬ মার্চ আবার শুরু হয় ক্যাম্প। ঢাকা আবাহনীর বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে জয়ের পর ১৮ মার্চ ক্যাম্পে যোগ দেন রোনান সুলিভান ও তাঁর ভাই ডেকলান। মাত্র কয়েক দিনের অনুশীলনে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে রোনান বুঝিয়ে দেন, তিনি বিশেষ কিছুর জন্যই এসেছেন।
দলের বেশির ভাগ ফুটবলার ঘরোয়া লিগের শীর্ষ দলগুলোতে খেলছেন। গোলকিপার মাহিন, মিডফিল্ডার কামাল ঢাকা মোহামেডানে, সেন্টার ব্যাক ইউসুফ, মিডফিল্ডার চন্দন বসুন্ধরা কিংসে। সেন্টার ব্যাক ও অধিনায়ক মিঠু ও লেফট উইঙ্গার মোর্শেদ ফর্টিস এফসিতে, মিডফিল্ডার ফয়সাল আর ফরোয়ার্ড মানিক পিডব্লুউডিতে। সেন্টার ব্যাক রিয়াদ ঢাকা আবাহনীতে খেলেন।
কোচিং স্টাফের মূল্যায়ন
দলের কোচিং স্টাফদের মতে, রোনানের বড় শক্তি হলো তাঁর ‘গেম সেন্স’ ও দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। নানি বাংলাদেশি হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পাওয়া এই তরুণের মধ্যে দেশের প্রতি টান চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি গোলের পর লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে তাঁর উল্লাস ছিল অকৃত্রিম। সহকারী কোচ আকবর হোসেন রিদন মালে থেকে ফোনে বলেন, ‘পরিচর্যা করতে পারলে বাংলাদেশের নাম্বার নাইন সংকট সে দূর করতে পারবে। একটা দেশে প্রথম এসেই ওর মধ্যে যে দেশাত্মবোধ দেখেছি তা অসাধারণ। গেম সেন্স খুব ভালো। সহজেই সবকিছু বুঝতে পারে।’
অন্যান্য প্রবাসী ফুটবলারদের ভূমিকা
শুধু রোনান নন, ইংল্যান্ড প্রবাসী ইব্রাহিম নেওয়াজও সম্ভাবনাময় ফুটবলার। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে শুধু প্রথম ম্যাচটা খেলেন ফিটনেস সমস্যার কারণে। রিদন বলেন, ‘ইব্রাহিম নেওয়াজের গেম নলেজ অত্যন্ত উঁচু মানের। বয়সভিত্তিক ক্যাম্পে তাদের আরও আগে আনা গেলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে।’ রোনানের ভাই ডেকলান ফাইনালসহ দুটি ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
দলের গঠন ও পরিচালনা
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলের সাফে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে চাবিকাঠি ছিল দীর্ঘদিনের বোঝাপড়া। বাফুফে এলিট একাডেমির এই দলটির ফুটবলাররা অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায় থেকেই একসঙ্গে খেলে আসছেন, যার ফল পাচ্ছে বাংলাদেশ। আইরিশ কোচ মার্ক কক্স গত ১২ মার্চ ঢাকায় আসেন এবং তাঁর হাতে দেওয়া হয় দলের দায়িত্ব। তবে মাঠের কৌশলে দেশীয় কোচ আকবর হোসেন রিদন ও আতিকুর রহমানের ওপর আস্থা রেখেছিলেন তিনি। গোলকিপার কোচ বিপ্লব ভট্টাচার্যের অধীনে গোলরক্ষকদের আত্মবিশ্বাস এবং বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সরাসরি তত্ত্বাবধান দলটিকে একটি পরিবারে পরিণত করেছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
সাফের এই ট্রফি শুধুই একটি শিরোপা নয়, বরং রোনান সুলিভানের মতো উদীয়মান তারকাদের হাত ধরে বাংলাদেশের ফুটবলের আগামীর ইঙ্গিত। হৃদয়ে বাংলাদেশ আর মাথায় ফুটবল ম্যাচ জয়ের জেদ থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব, অনূর্ধ্ব-২০ দল আরও একবার তা প্রমাণ করল। ফুটবল বোদ্ধাদের বিশ্বাস, রোনানকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ‘নাম্বার নাইন’ বা স্ট্রাইকার সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলতে পারে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দল আজ সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ঢাকায় ফিরবে, তাদের এই সাফল্য দেশের ফুটবল প্রেমীদের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।



