সঞ্জু স্যামসনের 'প্রায় সেঞ্চুরি' ত্রয়ী ও ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের পথে তাঁর অবদান
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর স্যামসনের পিঠ চাপড়ে দেন বরুণ চক্রবর্তী। এই জয়ের পেছনে সঞ্জু স্যামসনের ব্যাটিংয়ের আলো ছড়ানো ভূমিকা ছিল অপরিসীম। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সাবেক ভারতীয় স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের একটি ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলো না, কিন্তু স্যামসনের পারফরম্যান্সে মন খারাপ করার কিছুই ছিল না।
অশ্বিনের ভবিষ্যদ্বাণী ও স্যামসনের প্রতিক্রিয়া
অশ্বিন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে এই বিশ্বকাপে সঞ্জু স্যামসন অন্তত তিনটি সেঞ্চুরি করবেন। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল, স্যামসনের একটাও সেঞ্চুরি নেই! তবে অশ্বিনের মন খারাপ হওয়ার কারণ নেই, কারণ স্যামসন সেঞ্চুরি না করলেও 'প্রায় সেঞ্চুরি' করেছেন তিনটি, এবং সেগুলো টানা তিন ম্যাচে। সুপার এইটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভারতের বাঁচা-মরার ম্যাচে তিনি ৫০ বলে অপরাজিত ৯৭ রান করেন, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪২ বলে ৮৯ রান করেন। এই দুটি ইনিংসই ম্যাচ জেতানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ফাইনালের আগে অশ্বিন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, 'সমস্যা নেই, ফাইনালে সে ঠিকই সেঞ্চুরি করবে।' আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে সেটিও হলো না, স্যামসন আউট হয়ে যান ৪৬ বলে ৮৯ রান করে। তবে ভারত আগে ব্যাটিং করে ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৫৫ রান করে ফেলার পর বিজয়ী হিসেবে একটি দলের নামই আসছিল, এবং সেটিই সত্যি হলো। অশ্বিন মন খারাপ করবেন কেন!
শুরুতে বেঞ্চে থাকা থেকে নায়কে পরিণত হওয়া
বিশ্বকাপের শুরুতে ভারতের একাদশে সুযোগ পাচ্ছিলেন না স্যামসন। নামিবিয়ার বিপক্ষে প্রথম সুযোগ পেয়ে ২২ রানে আউট হলেন, এরপর আবার বেঞ্চে ফিরে যান। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নেমে করেন মাত্র ২৪ রান। তখন ভারতের ভরসা ছিলেন ঈশান কিষান ও অভিষেক শর্মা। কে জানত, সেই স্যামসনই ভারতকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে তোলার পথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন। টুর্নামেন্টের শুরুতে একাদশের বাইরে থাকা স্যামসনই সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ টানা তিন ম্যাচে দলের সর্বোচ্চ স্কোরার হয়ে উঠেন।
ফাইনালে অভিষেক শর্মার দ্রুততম ফিফটি ও স্যামসনের রেকর্ড
ফাইনালের আগেই স্যামসন তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশা এত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে এই ম্যাচে এর চেয়ে কম কিছু হলে তাঁকে 'ব্যর্থ'ই বলতে হতো। ভারতীয় ওপেনার সেটা বলার কোনো সুযোগই রাখলেন না। ফাইনালে ৩৩ বলের ফিফটি তাঁকে বসিয়ে দিয়েছে এক অভিজাত তালিকায়। ২০০৯ সালে শহীদ আফ্রিদি ও ২০১৪ সালে বিরাট কোহলির পর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের একই আসরের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ফিফটি করার কীর্তি এখন স্যামসনেরও।
আজ ভারতের ব্যাটিং তাণ্ডবটা অবশ্য স্যামসন শুরু করেননি, করেছিলেন এত দিন অফ ফর্মে থাকা অভিষেক শর্মা। বিশ্বকাপ শুরু করেছেন টানা তিন ম্যাচে শূন্য দিয়ে। একটি ফিফটি করলেও সেটি ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। সব মিলিয়ে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের এক নম্বর ব্যাটসম্যান ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। টুর্নামেন্টের আগের ৭ ম্যাচে মোট রান মাত্র ৮৯, ফিফটির ইনিংসটা বাদ দিলে বাকি ৬ ইনিংসে রান যোগ করলে হয় মাত্র ৩৪।
সেই অভিষেক আজ ফিরলেন চেনা খুনে মেজাজে। মাত্র ১৮ বলে ফিফটি করে গড়ে ফেললেন বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড, যা এই টুর্নামেন্টেও দ্রুততম ফিফটি। অভিষেক আউট হওয়ার আগে স্যামসনের সঙ্গে গড়েছেন মাত্র ৪৩ বলে ৯৮ রানের বিধ্বংসী এক উদ্বোধনী জুটি। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনাল ম্যাচে এটিই প্রথম পঞ্চাশোর্ধ্ব ওপেনিং জুটি।
স্যামসনের ছক্কার রেকর্ড ও ট্রফি জয়
অভিষেক যখন ওপাশ থেকে তলোয়ার চালাচ্ছিলেন, সঞ্জু তখন তুলনায় বেশ শান্ত। দুজনের ৯৮ রানের জুটিতে স্যামসনের রান ছিল ২২ বলে মাত্র ৩৮! তবে ২১ বলে ৫২ রান করে অভিষেক আউট হওয়ার পর সঞ্জু নিলেন নিউজিল্যান্ড বোলারদের কচুকাটা করার দায়িত্ব। ইনিংসের ১৬তম ওভারে যখন নিশামের বলে আউট হলেন, ততক্ষণে নামের পাশে ৫টি চার আর ৮টি বিশাল ছক্কা। এই টুর্নামেন্টে মোট ২৪টি ছক্কা মেরেছেন সঞ্জু, যা এক আসরে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডও।
তবে এত সব রেকর্ড নয়, স্যামসনের চাওয়া ছিল নিশ্চয়ই একটা—ফাইনালে তাঁর এই ইনিংসটা যেন ভারতকে বিশ্বকাপের ট্রফি এনে দেয়। সতীর্থ বোলাররা নিউজিল্যান্ডকে ১৪৯ রানে অলআউট করে দেওয়ায় সেই ট্রফি তো পেয়েছেনই, সঙ্গে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটাও এসেছে বাড়তি পাওয়া হিসেবে। স্যামসন আউট হয়ে ফেরার পথে তাঁকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখান দর্শকরা, যা তাঁর অবদানের স্বীকৃতি।



