ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল ডোপ টেস্টে, ফিফার নিষেধাজ্ঞায় ক্যারিয়ার শেষ
ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ শেষ ডোপ টেস্টে, ফিফার নিষেধাজ্ঞায় ক্যারিয়ার শেষ

ফুটবল থেকে সবকিছুই পেয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা। দিয়েছেনও দুই হাত ভরে। অথচ পরপর তিন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মহারথী হয়ে থাকা ম্যারাডোনার গল্প থেমেছিল নিষিদ্ধ ওষুধ খেয়ে। ফিফার নিষেধাজ্ঞায় নিজের ক্যারিয়ারটাও ভালোভাবে শেষ করতে পারেননি তিনি।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ: হারানো রাজত্ব ফিরে পাওয়ার লড়াই

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল ম্যারাডোনার জন্য হারানো রাজত্ব ফিরে পাওয়ার লড়াই। একে তো নেশার ছোবল, সঙ্গে ফর্মহীনতা—৩৩ বছর বয়সী ম্যারাডোনার জন্য সময়টা কোনোভাবেই ভালো যাচ্ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ফুটবলের ব্যাপ্তি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, ম্যারাডোনা সেখানে সেভাবে তাল মেলাতে পারছিলেন না। বরং বেড়ে যায় ওজন, খেলাতেও পড়ে প্রভাব। বিশ্বকাপ আসতে আসতে ম্যারাডোনার দলে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল।

মাদক সেবন ও নিষেধাজ্ঞা

১৯৯১ সালে মাদক সেবনের কারণে ১৫ মাস নিষিদ্ধ হন ম্যারাডোনা। সে সময়ই ধরা পড়ে, ম্যারাডোনা বহু বছর ধরেই নিয়মিত মাদক সেবন করছেন। একে তো নিষিদ্ধ হওয়া, সঙ্গে বদলে যাওয়া ফুটবল। সব মিলিয়ে ফুটবল থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ম্যারাডোনা। ঠিক তখনই ডাক আসে আর্জেন্টিনা দল থেকে। বিশ্বকাপে সুযোগ পেতে হলে খেলতে হবে বাছাইপর্ব। আর সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে না পারলে বিশ্বকাপ বাসায় বসে দেখতে হবে আলবেসিয়েস্তাদের।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাছাইপর্বে ফিরে আসা

ম্যারাডোনা ফিরলেন দলকে বাঁচাতে। প্রথম লেগে ১-১ গোলে ড্র, দ্বিতীয় লেগে ঘরের মাটিতে ১-০ গোলের জয়। বিশ্বকাপের আগেই আবারও জনগণের হিরো বনে যান তিনি। কোচও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, এই সময়ের মধ্যে যেভাবেই হোক ওজন কমাও। ম্যারাডোনাও বাধ্য ছাত্রের মতো ওজন কমালেন প্রায় ১৫ কেজি। আমেরিকা বিশ্বকাপে দেখা মিলল এক নতুন ম্যারাডোনার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বকাপের সূচনা ও ডোপ টেস্ট

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ গ্রিসের বিপক্ষে। ম্যারাডোনা সূচনা করলেন গোল দিয়ে। অতঃপর বুনো উল্লাস, যেন চোখ-মুখ বড় করে সেই উদ্‌যাপন দেখিয়ে দিল, তিনি এসেছেন সবটা জয় করে নিয়ে যেতে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষেও সেই দুর্দান্ত ম্যারাডোনা। ২-০ গোলের জয় নিয়ে সবাই যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, ম্যারাডোনার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় কাগজ। র‍্যান্ডম ডোপ টেস্টের জন্য ডাকা হয়েছে তাঁকে।

ডোপ টেস্টে পজিটিভ ও নিষেধাজ্ঞা

ফুটবল ম্যাচ শেষে যে কাউকেই ডোপ টেস্টের জন্য ডাকা হতে পারে। এ ঘটনা বেশ স্বাভাবিক, কিন্তু ম্যারাডোনার জন্য স্বাভাবিক ছিল না। কারণ, ফিফা জানত, মাদক সেবনের ইতিহাস আছে ম্যারাডোনার। সে নিয়ে ফিফা তাঁর সঙ্গে কথাও বলতে এসেছিল, বিশ্বকাপের সময় তাঁর ড্রাগ টেস্ট করা হবে না। কিন্তু ম্যারাডোনার রক্তে মাদকের সঙ্গে পাওয়া গেল নিষিদ্ধ ‘এফেড্রিন’, যা মূলত পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই ফিফা তাঁকে নিষিদ্ধ করে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি হুলিও গ্রন্দোনা সিদ্ধান্ত নেন, বিতর্ক এড়াতে হলে ম্যারাডোনাকে দল থেকে সরিয়ে নিতে হবে।

ম্যারাডোনার প্রতিক্রিয়া

ম্যারাডোনা নিজেও জানতেন সেই কথা। নিষিদ্ধ হওয়ার পর ম্যারাডোনা প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন, ‘ওরা আমার পা কেটে ফেলেছে’। তাঁর দাবি ছিল, ব্যক্তিগত ট্রেইনার তাঁকে ‘রিপ ফুয়েল’ নামের এনার্জি ড্রিংক দিয়েছিলেন, যা আর্জেন্টিনায় বৈধ। কিন্তু সেটার আমেরিকান ভার্সনে ছিল এফেড্রিন, যা তিনি জানতেন না।

ম্যারাডোনা এও দাবি করেন, ফিফা তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়েছে, কারণ, সেই বিশ্বকাপে তেমন বড় কোনো তারকা ছিল না। আমেরিকায় ফুটবলের বাজার তৈরি করতে তাঁকে যেমন বিশ্বকাপে আনা হয়েছে, তেমনই তাঁকে নিষিদ্ধ করে তারা বাজার বাড়াতে চেয়েছে। সত্যি বলতে ’৯৪ বিশ্বকাপের আমেজ বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞার পর।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ শেষ ও ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার সমাপ্তি

ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ হওয়ার পরই শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ। গ্রুপ পর্বে বুলগেরিয়ার কাছে আর নকআউট পর্বে রোমানিয়ার কাছে হেরেই বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার। ম্যারাডোনার ১৭ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় এই নিষেধাজ্ঞায়। বিশ্বকাপ থেকে ফিরে বোকা জুনিয়র্সের হয়ে আরও দুই বছর খেলে ফুটবল থেকে বিদায় নেন তিনি।