হোয়াটসঅ্যাপে মারাত তারেককে প্রথম বার্তা পাঠানো হয়, সেখান থেকেই শুরু। নিজের পরিচয় দিয়ে সাক্ষাৎকারের আগ্রহ জানানো, কী জানতে চাই তা খুলে বলা। তখন ২২ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার অনুশীলন শেষে সেগুনবাগিচার ক্যাম্পে ফিরছিলেন। ব্যস্ততার মাঝেই সময় দিলেন। কথায় কথায় উঠে এলো তার ভিন্নধর্মী বেড়ে ওঠা, বহুজাতিক পরিচয় আর প্রথমবার বাংলাদেশের ফুটবলে পথচলার গল্প।
বহুজাতিক পরিচয় ও শৈশব
রাশিয়ান মা ও ক্যামেরুনিয়ান বক্সার বাবার একমাত্র সন্তান মারাত তারেক। জন্ম ক্যামেরুনে, তবে মাত্র দুই বছর বয়সেই বাবা-মায়ের সঙ্গে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। সেখানেই বড় হয়ে ওঠা। বাবা মুহাম্মদ তারেকের পেশা বক্সিং; পেশাদার বক্সার হিসেবে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন, এখন কোচ হিসেবেও কাজ করছেন। মা নাতালিয়া লিভিনোভা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
ফুটবলেই ঝোঁক
বাবার হাত ধরে ছোটবেলায় বক্সিং রিংয়ে যাওয়া, খেলার প্রতি আগ্রহ; সবকিছুই ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে টেনেছে ফুটবল। দেশের ঘরোয়া ফুটবলে পিডাব্লিউডির হয়ে খেলা মারাত বলছিলেন, ‘বক্সিং রিংয়ে বাবার হাত ধরে যেতাম। বক্সিং ভালোই লাগতো। তবে ফুটবলেই ঝোঁক ছিল বেশি। ফুটবল তো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় খেলা। বাবার কোচিংয়ের চাকরির সুবাদে সার্বিয়াতে গিয়ে একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বাবা-মা আমার পেশা নিয়ে কখনও কিছু বলেনি। এমনকি বাবা কখনও বক্সার হওয়ার জন্য বলেনি। আমিও বিভিন্ন দেশ ঘুরে এখন বাংলাদেশে খেলছি। যদিও আমরা থাকি মস্কোয়।’
বাংলাদেশের ফুটবলে রুশ ঐতিহ্য
বাংলাদেশের ফুটবলে তারেকের আগমন যেন পুরনো এক স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ৯০-এর দশকে ঢাকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডানে রাশিয়ান এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ফুটবলারদের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। সের্গেই ঝুকভ, অ্যালেক্সি আরিফিয়েভদের মতো মিডফিল্ডাররা আবাহনীর জার্সিতে আলো ছড়িয়েছেন। অন্যদিকে মোহামেডানে বরিস কুজনেৎসভ, জীবতনিকভ, সের্গেই নভিকভ, আজামত আবদু রহিমভদের পারফরম্যান্সও ছিল স্মরণীয়। সেই ধারাবাহিকতায় শেখ রাসেলে খেলেছেন স্ট্রাইকার এডওয়ার্ড।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবার রাশিয়ান পরিচয়ে বাংলাদেশের লিগে নাম লিখিয়েছেন মারাত তারেক। যদিও নিজেকে ঝুকভ বা রহিমভদের কাতারে ফেলতে চান না তিনি, তবু ইতিহাসটা জানা আছে তার। বলছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি এটা জানি। বাংলাদেশে বড়মাপের রাশিয়ান খেলোয়াড়রা খেলেছে। এখানে ফুটবলের ঐতিহ্য আছে। শুনেছি দর্শকও হতো তখন। ফুটবলের প্রতি আলাদা করে ক্রেজও ছিল। এখন এখানে এসে তা কম দেখছি।’
বর্তমান লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় পর্বে খেলছেন মারাত। পিডাব্লিউডির হয়ে এরই মধ্যে তিনটি গোল করেছেন। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলকে বাঁচানোই এখন বড় লক্ষ্য তার, ‘দেখুন, আমি এখানে প্রথম খেলছি, চাইবো কিছু একটা করতে। এরই মধ্যে কয়েকটি ম্যাচও শেষ হয়েছে। আমার দল এমনিতে ধুঁকছে। আগে চাইবো পারফরম্যান্স দেখিয়ে দলকে রেলিগেশন থেকে রক্ষা করতে। তারপর চাইবো একের পর এক গোল করতে—যেন সবাই মনে রাখে।’
রাশিয়ার ফুটবলে অনুপস্থিতি
তবে ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজের দেশ রাশিয়ার অনুপস্থিতি তাকে ব্যথিত করে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসনের পর ফিফা ও উয়েফা রাশিয়াকে সব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। ফলে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২৪ ইউরো এবং আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবগুলোতেই বাইরে রাশিয়া। এই প্রসঙ্গে তারেকের কণ্ঠে আক্ষেপ স্পষ্ট, ‘আমরা ফুটবলপ্রিয় দেশ। টানা দুই বিশ্বকাপে না খেলতে পেরে আমরা ব্যথিত। বিশ্বকাপে রাশিয়ার না থাকাটা অনেক কষ্টের, এটা বলে বোঝানো যাবে না। শুধু বিশ্বকাপ নয়, আমাদের খেলোয়াড়রা ফিফার ক্লাব কাপেও খেলতে পারছে না। আগে কনফারেন্স লিগে খেললেও চার বছর ধরে এখন নেই।’
ভারতের ফুটবলের সঙ্গে তুলনা
ভারতের আই লিগে রিয়েল কাশ্মীরের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনায় ভারতের ফুটবলকে বেশি সুসংগঠিত মনে হয়েছে তার কাছে, ‘আমি ওখানে আই লিগে খেলেছি। ওদের মাঠ কিংবা আয়োজনে বড় কোনো সমস্যা চোখে পড়েনি। সুসংগঠিত মনে হয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষ লিগ তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। সেটা মাঠ বা অন্যান্য দিক দিয়ে বলতে পারেন। তবে খেলার মানের দিক দিয়ে দুই দেশের তেমন পার্থক্য দেখছি না।’
ঢাকায় অভিজ্ঞতা
ঢাকায় এসে সবচেয়ে বড় যে অভিজ্ঞতা, তা হলো যানজট—তবে সেটাও নতুন নয় তার কাছে। মস্কোর অভিজ্ঞতা টেনে বললেন, ‘মস্কোতে অফিস ছুটির সময় অনেক জ্যাম হয়। ঢাকাতেও একই অবস্থা। তবে এখানে একটু বেশি মনে হয়। এছাড়া গরম বেশি, আদ্রতাও। খাওয়া-দাওয়া তেমন সমস্যা হচ্ছে না। চিকেন কিংবা হলুদ রাইস (চাইনিজ) খাচ্ছি। অবসরে বিলিয়ার্ড খেলছি। ক্লাবেই সময় কাটে বেশ।’



