অমিত হাসান: আড়াল থেকে আলোয় আসা টেস্ট দলের নতুন সদস্য
অমিত হাসান: আড়াল থেকে আলোয় আসা টেস্ট দলের নতুন সদস্য

অমিত হাসান। বিসিবির মিরপুরের একাডেমি ভবনে প্রতিদিনই ক্রিকেটারদের আনাগোনা লেগেই থাকে। তাঁদের দিকে তাক করা থাকে ক্যামেরার লেন্স। ফেসবুক ‘রিলসের’ যুগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সব ঘটনাই যেন ‘খবর’ হয়ে যায়। সে রকম ‘খবরের’ মধ্যে যাঁরা কম থাকেন, তাঁদের একজন অমিত হাসান। নীরবে–নিভৃতে বহুবার তিনি মিরপুরে এসে আবার চলেও গেছেন। কেউ চিনতে পারলে হয়তো বলেছেন, ‘ওহ, আপনিই সেই অমিত!’ নয়তো থেকে গেছেন আড়ালে।

কে এই অমিত?

এই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ দলের একজন সদস্য। বাংলাদেশ দলে ডাক পাওয়া নতুন ক্রিকেটার। এটুকু আসতে অমিতকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। নারায়ণগঞ্জের ছেলে হলেও রাজিন সালেহর হাত ধরে ঠিকানা বদলে জাতীয় ক্রিকেট লিগে খেলেন সিলেট বিভাগের হয়ে। টি–টুয়েন্টির যুগে এনসিএল–বিসিএলের আবেদন কম হওয়ায় তাঁর মতো ক্রিকেটারদের চেনা হয়ে ওঠে না সবার। তবে অমিতকে এখন আর না চিনে উপায় নেই।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক

অমিতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ২০১৯ সালে জাতীয় লিগে। ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেটে অমিত এখনো ‘বড় তারকা’ হয়ে না উঠলেও নিয়মিত পারফরমার। প্রথম শ্রেণিতে ৪৯ ম্যাচের ক্যারিয়ারে প্রায় ৫০ গড়ের ব্যাটিং আর ১১ সেঞ্চুরির পর অমিতকে টেস্ট দলে সুযোগ দিতে একরকম বাধ্যই হয়েছেন নির্বাচকেরা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ২০১৯ সালে জাতীয় লিগে। এর ৭ বছর পর টেস্ট দলে, তবু খুব একটা রোমাঞ্চিত মনে হলো না অমিতকে। শুধু বলেছেন, ‘সব খেলোয়াড়ের মতো আমারও স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলার। ডাক পাওয়ার পর অনেক ভালো লাগছে।’

প্রধান নির্বাচকের ডাক

প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের দেওয়া সেই ‘ডাক’ পাওয়ার খবরের পর থেকেই ফোন রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না অমিত। বন্ধু–পরিচিতজনদের জানানো অভিনন্দনে সিক্ত হচ্ছেন প্রতি মুহূর্তে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসা স্বপ্নপূরণের উপলক্ষে তাতে অবশ্য বিরক্তি আসছে না অমিতের।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাতীয় লিগে অসাধারণ রান

গত এক দশকে যে দুজন ক্রিকেটার জাতীয় লিগে এক মৌসুমে ৭০০–এর বেশি রান করেছেন, তাঁদের একজন অমিত। বিসিবির প্রিমিয়ার লিগে সুযোগ মেলে না, প্রিমিয়ার লিগেও থাকেন আড়ালে। অমিত তাই বেশি আপন করে নিয়েছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকেই। গত এক দশকে যে দুজন ক্রিকেটার জাতীয় লিগে এক মৌসুমে ৭০০–এর বেশি রান করেছেন, তাঁদের একজন অমিত। ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন দুটি, এর একটিতে পরের ইনিংসেও ছিল সেঞ্চুরি। দিন দুয়েক আগে শেষ হওয়া বিসিএলের প্রথম রাউন্ডের ম্যাচেও পূর্বাঞ্চলের হয়ে ১৬২ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন।

হতাশা নয়, ধৈর্য

এত রান করেও আরও আগে কেন জাতীয় দলে ডাক পেলেন না, এমন হতাশাও কখনো আক্রান্ত করেনি অমিতকে। বরং সব সময়ই মনে হয়েছে ঠিক পথেই তো এগোচ্ছেন, ‘আমি সব সময়ই নির্বাচকদের নজরে ছিলাম। এইচপিতে ছিলাম, “এ” দলেও। তিন চার–বছর ধরে ক্যাম্পে ক্যাম্পেই কাটছে। ওনাদের যখন মনে হয়েছে, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া উচিত, তখনই দিয়েছেন।’

বয়স এখন ২৪, সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ পথ। সে যাত্রায় অমিতকে শক্তি জোগাবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতা, ‘লম্বা সময় যাবৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলছি, যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, চেষ্টা করব সেটা যেন জাতীয় দলে কাজে লাগানো যায়।’

প্রিয় ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম

ছোটবেলায় রাহুল দ্রাবিড়ের খেলা দেখতেন। তবে অমিতের সবচেয়ে প্রিয় ব্যাটসম্যান বাংলাদেশের একজন—মুশফিকুর রহিম। কয়েক বছর ধরে এনসিএলে সিলেট আর বিসিএলে পূর্বাঞ্চলে যাঁর সতীর্থ হিসেবেই খেলছেন অমিত। অমিতের সবচেয়ে প্রিয় ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। শামসুল হকের মতো উইকেটকিপিং করেন অমিতও, ভালো লাগে তাঁর জীবনযাপনের ধরন আর নিয়মানুবর্তিতা। যাঁদের আদর্শ মানেন, অমিত নিশ্চয়ই চাইবেন সেই দ্রাবিড় আর মুশফিকের মতোই লম্বা হোক তাঁর ক্যারিয়ার। এ প্রসঙ্গে একটু লজ্জাই পেয়ে যান এই স্বল্পভাষী ব্যাটসম্যান, ‘এত লম্বা চিন্তাভাবনা তো করি না। সব সময় বর্তমানে থাকতে পছন্দ করি।’

ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ

ধৈর্যের পরীক্ষায় পাস করেই অমিত এখন জাতীয় দলে। বড় মঞ্চে এসে শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তাঁর প্রত্যাশা একটাই, ‘জীবনে উত্থান–পতন তো থাকবেই। আমি চাই আমার খারাপ সময়েও যেন সবাই পাশে থাকে।’ কঠিন সময় পার করেই অবশ্য অমিত আজ এখানে। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আড়াল থেকে কীভাবে আসতে হয় আলোয়—সেটি যে তাঁর ভালোই জানা!