মালামাল পাওয়ার আশায় ভ্যান নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন চালক ইউসুফ। সিমেন্ট, রডসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করেন তিনি। গতকাল বেলা ১১টায় ঢাকা উদ্যানের ১ নম্বর রোডের মাথায় একটি চা–দোকানের সামনে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। কাঁধে ছেঁড়া গামছা, গায়ে ধুলোমাখা টি-শার্ট, পরনে জীর্ণ লুঙ্গি। তাঁর নাম জানতে চাইলে বললেন, ইউসুফ।
গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে ভ্যানচালক ইউসুফের সঙ্গে কথা হলে তাঁকে বেশ অস্থির মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল তাঁর অস্থিরতার কারণ। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কোনো ভাড়া পাননি তিনি। কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে বললেন, ‘আগে খ্যাপ পাইতাম। এহন মানুষ কম নেয়...।’
কখনো সিমেন্টের ব্যাগ, কখনো রড, কখনো কারও বাসা বদলের মালপত্র বহন করেন ইউসুফ। নিজের বয়স ঠিক কত, সেটি জানেন না তিনি। এমনকি নামের আগে–পরে কিছু আছে কি না, সেটাও বলতে পারেন না। তাঁর শুধু মনে আছে, ১৯৮৬ সালে ভোলার বাড়ি নদীতে ভেঙে গিয়েছিল। তখন মাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ওই সময় বয়স ১৩–১৪ হবে হয়তো। বাবা মারা গেছেন ঢাকায় আসার আগেই।
ঢাকায় এসে প্রথমে গাবতলী বাস টার্মিনালে গাড়ি ধোয়ামোছার কাজ করতেন ইউসুফ। পরে ১৯৯৬ সাল থেকে ভ্যান চালানো শুরু করেন। এর পর থেকে রাস্তার ধুলো, রোদ, বৃষ্টি—এসবই তাঁর সঙ্গী। থাকেন গাবতলীতে। ছোট্ট এক কক্ষের ঘর। মাসে ভাড়া তিন হাজার টাকা। সেই এক ঘরেই স্ত্রী, ১২ বছরের ছেলে আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সংসার। একটিমাত্র খাটে থাকেন মা আর মেঝেতে বিছানা পেতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুমান তিনি।
ইউসুফ জানান, প্রতি মাসের ২০ তারিখে ঘরভাড়া দেওয়ার কথা; কিন্তু এই এপ্রিল মাসের ভাড়া এখনো বাকি। বাড়িওয়ালা চাপ দিচ্ছেন, বকাঝকা করছেন; কিন্তু তিনি নিরুপায়। বললেন, ‘আর কোনোয়ানে তো যাওনের জায়গা নাই। কই থাইমু, কই যামু?’
আগে মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হতো ভ্যানচালক ইউসুফের। এখন ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যানের দাপট বেশি, ইঞ্জিনচালিত ছোট পিকআপও বেড়েছে। মানুষ এখন আর প্যাডেলচালিত রিকশাভ্যান নিতে চায় না। কোনো দিন তাঁর আয় ৪০০ টাকা, কোনো দিন ৫০০ টাকা হয়। যা আয় হয়, তা থেকে ১০০ টাকা দিতে হয় ভ্যানের মালিককে।
ইউসুফের বৃদ্ধ মা এখন আর চোখে দেখতে পান না। মায়ের দেখাশোনা করার কাজটি তাঁর স্ত্রীকে করতে হয়। ছেলেকে স্কুলে দেওয়ার কথাও একবার ভেবেছিলেন, কিন্তু সেটি আর হয়নি। গাড়ি মেরামত করার দোকানে ছেলেকে কাজ শিখতে দিয়েছেন। গাবতলীর যে এলাকায় ঘরভাড়া করে থাকেন, সেখানকার একটি মুদিদোকান থেকে প্রায়ই বাকিতে এটা–ওটা কিনতে হয়। কয়েকজনের কাছে কিছু টাকা দেনাও আছে। বাকি আর দেনার কারণে মুঠোফোন কেনার একটা শখ থাকলেও তা পূরণ করতে পারছেন না।
অন্যদিকে, ফুচকা বিক্রেতা মো. শাহীনের অবস্থাও ভালো নয়। আদাবর থানার মনসুরাবাদ এলাকায় একটি কিন্ডারগার্টেনের পাশের ফুটপাতে ফুচকা ও ভেলপুরি বিক্রি করেন তিনি। সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে তাঁর আয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। তবে স্কুল বন্ধ থাকলে আয় কমে যায়।
শাহীনের বয়স ৩৫। থাকেন গাবতলীর একটি মেসে। ভাড়া মাসে তিন হাজার টাকা। আট বছর আগে মাদারীপুর সদর উপজেলার শিলারচর গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় আসেন শাহীন। তাঁর বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও এক সন্তান গ্রামেই থাকেন। তাঁর ভাষায়, ‘ঢাকায় ঘর লইয়া বউ-ছাওয়াল রাখমু কেমনে?’
শাহীন বলেন, ছয় মাস আগে স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। প্রতি মাসে অল্প অল্প করে দেনা শোধ করছেন। তিনি চান একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ছোট দোকান বসাতে। কিন্তু সেই পুঁজি তাঁর নেই। বললেন, ‘মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না।’



