বায়োস্কোপের হারানো জাদু: মায়ের শৈশব থেকে শিশুর কৌতূহল পর্যন্ত
ছুটির দিনে বাড়ির আঙিনায় ১০ পয়সার সেই ‘জাদুর বাক্স’ বা বায়োস্কোপে সিনেমা দেখার গল্প আজও মায়ের শৈশব স্মৃতির এক বড় অংশজুড়ে আছে। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত বৈশাখী মেলা থেকে তোলা একটি ছবি এই স্মৃতিগুলোকে আবারও জীবন্ত করে তুলেছে। সাইকেলের পেছনে বাঁধা কাঠের বাক্স, রংবেরঙের জামা আর বাবরির সেই বায়োস্কোপওয়ালার ডাক শুনলেই মা–মামারা নাকি নানার কাছে বায়না জুড়ে দিতেন।
শৈশবের সেই মধুর স্মৃতি
নানা যেদিন হাতে পয়সা গুঁজে দিতেন, সেদিন তাঁদের দৌড় থামত সেই জাদুর বাক্সের সামনে গিয়ে। টিনের ফোকরে চোখ রেখে ছবি দেখার সময় বায়োস্কোপওয়ালার খঞ্জনির তালে তালে গাওয়া গানের বর্ণনায় যেন সেই স্থিরচিত্রগুলোও জীবন্ত হয়ে উঠত তাঁদের কাছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু বিনোদন নয়, একটি সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ ছিল, যা গ্রামীণ জীবনের সরল আনন্দকে প্রতিফলিত করত।
আধুনিক যুগে বায়োস্কোপের অবস্থান
তবে আমার সময়ে টেলিভিশনের সহজলভ্যতা আর বর্তমানে স্মার্টফোন কিংবা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে বায়োস্কোপের সেই চল আজ বিলুপ্তপ্রায়। এখন মেলা বা বিশেষ উৎসব ছাড়া এর দেখা মেলা ভার। এই পরিবর্তন প্রযুক্তির অগ্রগতির একটি স্বাভাবিক ফল, কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু ঐতিহ্যবাহী উপাদান হারিয়ে যাচ্ছে।
শিশুর চিরায়ত কৌতূহলের জয়
তবে আধুনিক প্রযুক্তির এই প্রবল দাপটও শিশুর চিরায়ত কৌতূহলের কাছে হার মেনেছে। তাই তো হাতের কাছের ডিজিটাল পর্দা সরিয়ে রেখে ‘জাদুর বাক্সের’ অজানাকে চেনার এই আকুল প্রচেষ্টা। শিশুটির এই অদম্য কৌতূহল যেন আশির দশকের শেষ ভাগে আমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া সেই শৈশবকেই আজ আমার সামনে জীবন্ত করে তুলল। এটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের মৌলিক আবেগ ও কৌতূহল অপরিবর্তিত থাকে।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ
বৈশাখী মেলার মতো আয়োজনগুলো বায়োস্কোপের মতো হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠান এই প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষও এই সাংস্কৃতিক ধারাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।
এই গল্পটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মূল্যবোধ ও আনন্দকে ধরে রাখা জরুরি। শিশুরা যখন বায়োস্কোপের দিকে তাকায়, তখন তারা শুধু একটি বিনোদন মাধ্যমই দেখে না, তারা দেখে একটি যুগের ইতিহাস এবং মানবিক সংযোগের শক্তি।



