জন্মান্তরের বৃত্ত: ঘাঘট থেকে বুড়িগঙ্গা, এক নারীর আত্মজিজ্ঞাসা
জন্মান্তরের বৃত্ত: ঘাঘট থেকে বুড়িগঙ্গা

প্রখর স্মৃতির অধিকারী এক নারী তার জন্মরাতের কথা স্মরণ করেন। যোনি চিরে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকে শুরু করে ঘাঘট নদীর স্যাঁতসেঁতে পরিত্যক্ত ঘাটে মায়ের শুয়ে থাকা, তীব্র জ্যোৎস্নায় চারপাশের গাঢ় ছায়া, ঝিঁঝিপোকার ডাক ও দূরের মন্দির থেকে ভেসে আসা ঢাকঢোলের আওয়াজ—সবই তার মনে আছে। পাশে হাঁটু গেড়ে বসা এক বিশ্বস্ত নারী প্রসূতির মুখ চেপে ধরে আর্তনাদ গোপন করেন; আর ব্যথায় মোচড়ানো শরীরের অন্ধকার গহ্বরে তিনি আওড়াচ্ছিলেন পূর্বজন্মের শোক। প্রসবের পরমুহূর্তেই চোখ খুলে আদিগন্ত আকাশের মাঝে গোলাকার হলুদ চাঁদ দেখে তার মনে পড়ে যায়, দু’দিন আগেই চার গোরখোদক তাকে দাফন করেছিল। কিন্তু পাশে নুয়ে থাকা অসার ক্ষীণদেহী শরীর দেখে পূর্বজন্মের শোক ভুলে তিনি আলিঙ্গন করেন বর্তমানকে, ঘুণে ধরা চাঁদকে, ভরা জোয়ারের নদীকে ও সদ্য মৃতা মাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৃত্তে আবদ্ধ জীবন ও চিত্রাদির ভূমিকা

বৃত্ত দেখে জেগে ওঠা বোধ তার জীবনকে বৃত্তেই বাঁধে। দিনগুলো কালের পুনরাবৃত্তিতে আবদ্ধ হয়। সেই অদৃশ্য বাঁধের উপস্থিতি বুঝে তার অবচেতন বারবার ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তাকে পথে ফেরায় চিত্রাদি—যে জন্ম-পরমুহূর্তেই শব থেকে নাড়ি ছিঁড়ে ঘাঘটের জল ছুঁইয়ে তাকে পাপমুক্ত করেছিল। নয় বছর বয়সে একবার দুজনে শুক্রবারের হাটে যায়। ভিড়ের শেষ মাথায় কুলফির দোকান দেখে বায়না করলে চিত্রাদি দু’টাকা হাতে দিয়ে বলে, ‘জলদি কিনে আন, মাথা ধরেছে, এখন ফিরবো।’ তিনি এক দৌড়ে দুইটা কুলফি কিনে এনে ফিরে এসে কোথাও খুঁজে পান না পরিচিত মুখ। ভিড়ের মাঝে ঝাপসা চোখে দিগ্‌বিদিক দৌড়াতে থাকেন, হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে নয়, চিত্রাদিকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করানোর অনুতাপে। হঠাৎ পেছন থেকে টেনে ধরে কেউ—রুক্ষ স্পর্শেই বুঝতে পারেন চিত্রাদি। দ্রুত পায়ে হেঁটে রিকশায় তুলে নেয় সে তাকে। হুড তুলে দিতেই নিমিষে চারদিক অন্ধকার করে নামে ঝুম বৃষ্টি। তিনি মনে করেন চিত্রাদি জাদু জানে, তাই প্রতিবার ঠিক সময়ে আবরণ তুলে দেয়। বিদ্যুতের চমকে ভয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরলে চোখের পর্দায় ঝিলিক দেয় অতীত—এই তো সেই মায়াবিনী, প্রকৃতি বশের বিদ্যা যার নখদর্পণে, ঘাঘটের জল শাসন করে সে-ই তো অতলে তলিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচালো তাকে। গভীর রাতে মাতৃগর্ভের স্মৃতিকাতরতায় যখনই আর্তনাদ করে উঠতেন, সে তাকে শক্ত করে বুকে টেনে নিত। কখনো সুর করে শোনাত ঘাঘটের জলে সমাধিস্থ তার নামহীন সখীর গল্প। দুনিয়াবি কাজ শেষে নিমগ্ন চিত্তে দুপায়ে ঘুঙুর পরে মন্দিরের চাতালে সে নেচে যেত ঝমঝম ঝমঝম। শক্ত করে দু’চোখ বুজে কান পাতলে তিনি শুনতে পেতেন অতীত ফুঁড়ে ভেসে আসা সেই ঝংকার। সেইসব শব্দময় রাত আর মেঘে ঢাকা দুপুর, যতবার এ ভূমির তাপ তাকে নাড়ির টানে জর্জরিত করেছে, চিত্রাদি এসে তাকে ছুঁয়ে দিয়েছে, স্মরণ করিয়েছে তার জন্মরাত, চন্দ্রাচ্ছন্ন নদীর পাড় আর ঘাঘটের বুকে তার মায়ের মৃত্যুর তাৎপর্য। আর সম্বোহিত হয়ে তিনি পুনরায় আলিঙ্গন করে নিয়েছেন জীবনকে, তার বর্তমানকে।

ঢাকায় আগমন ও গতজন্মের প্রেমিকের সন্ধান

তবে জীবন তাকে প্রতি-আলিঙ্গন করেনি। তিনি থেকে যান গতজন্মের উদ্বৃত্ত, বর্তমানের কোলে এক অনাদরি অনাথ। তিনি বুঝতে পারেন জন্মলগ্নেই ভাগ্যদৃষ্ট হয়েছিল তার—প্রবল আকর্ষণে নিজের দিকে ঘাঘটের জল টেনে নেওয়া সেই চাঁদ ছিল তারই প্রতিবিম্ব, সেই পূর্ণিমা তার জীবনীশক্তি আর আসন্ন কৃষ্ণপক্ষ তার যাত্রা। চিত্রাদিকে ছেড়ে ঢাকা আসার সময় তার রুহ কি একবারও তাকে এই উলটো পথের যাত্রা নিয়ে সাবধান করেনি? যে প্রাচীন বৃত্তে সহস্র বছর ধরে পাক খেয়ে যাচ্ছে তার চরিত্র সম্পর্কে আগাম বার্তা দেয়নি?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জন্মস্থান জুড়ে ছড়িয়ে ছিল তার পূর্বনারীর আর্তনাদ। স্বল্প পড়াশোনায় কোনোরকম একটা চাকরি জুটিয়ে চলে এসেছিলেন ঢাকায়। শহুরে বৈচিত্র্যহীন যাপনে দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। মাপা মাপা পদক্ষেপ, শরীরজুড়ে ক্লান্তি—এইতো ধ্রুব। তবে একদিন স্বাভাবিকতায় চ্যুতি ঘটে। ভিড়ের মাঝে চোখে পড়ে পরিচিত এক মুখ—ফিরে দেখেন তার গতজন্মের প্রেমিক।

সে এক ভীষণ ত্রৈধবিন্দু, যখন অতীত জড়িয়ে পড়ে বর্তমানে, সমাপ্তি তার সমস্ত অস্তিত্ব হারায় আর পাতাল ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে রক্ত হিম করা অসহায়ত্ব। চোখে ধরা পড়া স্বল্প জ্ঞানের সাথে তার সম্পৃক্ততা দিয়ে কীভাবে বোঝাবেন তাকে, সে তার কত আপনজন! কী নামে ডেকে স্মরণ করাবেন, সহস্র বছর আগের এক প্রবল খরায় তারা দুজনে মন্ত্রবলে বৃষ্টি নামিয়েছিলেন, অতঃপর নিয়তি লঙ্ঘনের পাপে দেবীর অভিশাপে পুড়ে মরেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন, কতকিছুই যত্নে মনে রেখেছেন জন্মান্তরে, অথচ সেসব কিছুই ছিল কত অপ্রয়োজনীয়।

নীলের সাথে পুনর্মিলন ও সম্পর্কের গভীরতা

অসহায়ত্বের অবসান ঘটে দ্রুতই। তাদের দুজনের প্রায়ই দেখা হয়ে যেতে থাকে, যেখানে তাদের দেখা হওয়ার কথা না। কখনো বাসে, আধো আলো অন্ধকারে ঘামে ভিজে বাড়ি ফেরার পথে তারা দেখতেন দুজনকে, সম্পূর্ণ অচেনা, তবুও নেমে কী এক টানে হেঁটে যেতেন পাশাপাশি কিছুদূর। চোখাচোখি, কিছু খুচরো কথা, জরুরি আদান-প্রদান—এরপর যখন অজ্ঞানতার ভার তাকেও পোড়াতে থাকে, তারা সিদ্ধান্ত নেন, দেখা হলেই নিজেদের সম্পর্কে অপরকে একটা করে তথ্য দেবেন দুজনে। এভাবে তিনি একে একে জানতে পারেন ওর নাম এখন নীল, বাড়ি নওগাঁ, কাজ করে এক ওয়াশিং কারখানায়। নিজেদের খুঁজে পাওয়ার মতো খুব দরকারি তথ্য তো তারা কখনো দেননি, তবুও তাদের বারবার দেখা হয়ে যেত, কখনো ফুটপাতের দোকানগুলোতে, কখনোবা কাজ শেষে ফেরার পথে রাস্তার মৃদু আলোয়। এমনি একদিন, দোতলা বাসের সিঁড়িতে ওকে বসে থাকতে দেখেন। সেদিনের মতো নিজের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার মুহূর্ত এলে তিনি জানান, আজ ভোররাতে তিনি তাদের দুজনকে স্বপ্নে দেখেছেন।

সেদিন এরপর বাস থেকে নেমে তারা হাঁটতে হাঁটতে চলে যান কামরাঙ্গীরচরে। নির্জন একটা আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিং খুঁজে বের করে তার দোতলায় উঠে মেতে ওঠেন প্রেমে। চারিদিকে অন্ধকার; ভাঙা ইট-সিমেন্ট গলে ঠিকরে পড়ে চাঁদের আলোর মাঝে দুজনকে আঁকড়ে ধরে এক হয়ে বসে থাকেন দুজনে। অন্ধকারে শুধু জ্বলজ্বল করতে থাকে ওর ক্লান্ত দু’জোড়া চোখ—বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সেখানে গনগনে আগুনের মাঝে নৃত্যরত মৃত্যু দেখা যায়। সেই আগুন যেন আলেয়ার আলো, তার ওঠানামায় তিনি সম্মোহিত হয়ে পড়েন। নীল তাকে ছুঁতে থাকে। তিনি শরীরজুড়ে অনুভব করেন ওর দু’হাত ভর্তি ক্ষত, এবড়োখেবড়ো জখমি শরীর। দীর্ঘ চুম্বনের পর দৃষ্টিবিনিময়—নীল খুঁজে পায় তার চোখের সাদা অংশে ভাসতে থাকা লাল তিল। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তা একসময় পরিণত হয় অঙ্কুরিত গাছে, প্রবল ঢেউয়ের চাপে সমস্ত জীবনীশক্তি দিয়ে মাটি ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে সেটা। নীল তার চোখে চুমু দেয়। দুজনের অস্থির হৃদয় শান্ত হয় বহুকাল পর। কালের চক্রে তারা একে অপরের পরিপূরক, দুজন মিলেই পূরণ করেন সহস্র বছর পুরোনো প্রাচীন এক বৃত্ত। একসাথে ইবাদত করে যাবার জন্যই তাদের বারবার জন্ম।

নীলের অন্তর্ধান ও চিত্রাদির কাছে ফেরা

খুব বেশি দেখা হতো না তাদের। হয়তো দশদিন বা কখনো পনেরো দিন পর পর। দেখা হলে হেঁটে হেঁটে খুঁজে নিতেন কোনো আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিং বা পরিত্যক্ত রেললাইন অথবা অন্ধকার উদ্যান। একসাথে ঘুমিয়েও কাটাতেন কখনো। নিজেদের শরীর স্পর্শ করে করে পরস্পরকে চেনা-ই ছিল তাদের একমাত্র কাজ। শেষ রাতে কখনো তিনি ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে যেতেন তার বাড়ির কথা, কীভাবে সবার অগোচরে তাকে বড় করে চিত্রাদি। মায়ের নাম নেওয়া সে ভূমিতে মানা—ঘরের কোণে তাই মাটি খুঁড়ে তারা লুকিয়ে ফেলেছিলেন তার ঘুঙুর। নীল অবশ্য কখনোই ঘুমাতো না। কখনো ঘুম ভেঙে গেলে দেখতেন পাশে পিঠ সোজা করে বসে আছে চুপচাপ—ডাকলে বলতো ওর কখনো ঘুম আসে না, শুধু ঘুমের ভান করে স্বপ্ন দেখে। স্পর্শ করতে গেলে অনুভব করতেন উত্তাল হৃৎস্পন্দন, শরীর জুড়ে গভীর হয়ে আসা ক্ষত, ঘন হয়ে আসা আগুনের শিখায় ঢেকে পড়া চোখ।

হঠাৎ বহুদিনের ব্যবধান হয়ে যায়—তাদের আর দেখা হয় না। পরিচিত জায়গাগুলোতে খুঁজে না পেয়ে এরপর দিনের পর দিন একা গিয়ে বসে থাকতেন তাদের প্রথম দেখা হওয়া সেই আন্ডারকন্সট্রাক্টেড বিল্ডিংটার কাছে। ভাবতেন হয়তো তাকে খুঁজে চলে আসবে সে। তিনি আঁচ করতেন, নীলের বিপদ হয়েছে—ওর চোখে দেখা মৃত্যু তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। ওর খোঁজে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ঢাকা শহর ঘুরতে থাকেন তিনি। তবে দ্রুতই বেশ অসুস্থ হয়ে যান—বুঝতে পারেন, তার শরীরে জেগে উঠছে এক নতুন প্রাণ। নীলকে খোঁজার সমস্ত চেষ্টা যখন বিফলে যায়, তিনি বুঝতে পারেন চিত্রাদিই ভরসা। সেই তাকে পথে ফেরাতে পারে।

বাড়ি ফেরা ও চিত্রাদির শেষ কথা

বাড়ি ফিরে আসেন বহুদিন পর। ঘাঘট এখন শুকিয়ে গেছে। মন্দিরের পেছনের জঙ্গল কেটে গড়ে উঠেছে অলিগলি, বাড়ি—সেখানেই এক অন্ধকার কোণে ঘর পেয়েছে চিত্রাদি। ফিরে এসে চিনে নিতে কষ্টই হয় বেশ—দেখেন চিত্রাদির শরীর জুড়ে বসন্তের লালচে ক্ষত, হাত-পা শুকিয়ে দেখতে হয়ে গেছে ঠিক শেষ বসন্তের শিমুল গাছ। তিনি ওকে জড়িয়ে ধরেন—বোধহয় বেশিদিন পাবেন না আর, দ্রুতই সমস্ত শরীর জুড়ে গজিয়ে উঠবে পাতা। সে রাতে পাশাপাশি চুপচাপ শুয়ে চিত্রাদি জানায় কীভাবে তারা আবারও হয়ে গেছে উদ্‌বাস্তু—কারণ দেবোত্তর জমি চলে গেছে সব দখলে। কিন্তু মনে কোনো দু:খ রাখা উচিত নয় কারণ ঘাঘটের অভিশাপে ছারখার হয়ে গেছে তার নামহীন বাপ। চিত্রাদি হাসতে থাকে খলবল—যেন প্রাচীন ঘাঘটের স্রোত, যেই স্রোত রাতের অন্ধকারে গিলে খায় তার বাবার বাড়ির ধ্বংসাবশেষটাও। শুনতে শুনতে চিত্রাদির গায়ের দাগগুলো গুনতে থাকেন তিনি। কতকিছু হয়ে গেলো—শরীরভরা কতগুলো ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে চিত্রাদি। কী উদ্দেশ্য এই নদীরূপী-শিমুলরূপী নারীর? হাজারের পর গোনা বন্ধ করেন তিনি—তখন ভোর, চিত্রাদি এবার তাকে শোনায় এক রাজকুমারীর গল্প, কামরাঙ্গীরচরের নাম হয়েছিল যেই নারীর নামে।

“...বহুদিন আগে, বুড়িগঙ্গার চরে বাস করতো এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে কামরাঙ্গী। কিন্তু একদিন নৌকাডুবিতে তার মৃত্যু হয়। কামরাঙ্গীকে হারিয়ে তার প্রেমিক হয়ে পরে পাগলপ্রায়। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ‘হায় কামরাঙ্গী’, ‘হায় কামরাঙ্গী’ বলে গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে সে দৌড়াতে থাকে দিগ্‌বিদিক। বুড়িগঙ্গার চারদিকে কেবল উত্তাল ঢেউ, কোথাও নেই কামরাঙ্গী—এ দৃশ্য আর নিতে না পেরে যুবক ঝাপ দেয় বুড়িগঙ্গার জলে। এরপর? সেই জলরাশিতে হারিয়ে গিয়ে সে কী খুঁজে পেয়েছিল কামরাঙ্গীকে?...” চিত্রাদির ঘোরলাগা কণ্ঠস্বর তাকে মনে করিয়ে দেয় তার জন্মরাত। নদীই তার ঠিকানা—সেখানেই পাবেন তিনি যা খুঁজছেন।

বুড়িগঙ্গায় প্রত্যাবর্তন ও নীলের মৃত্যু

ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি। রাত-দিন ঘুরে ফিরেন বুড়িগঙ্গার আশপাশ। কতদিন পার হয়ে যায়—আর হিসেব থাকে না। যেন সময়ের আগে আর পিছে ঘুরপাক খেয়ে যান তিনি; কাঙ্ক্ষিত দিন-ক্ষণটা খুঁজে পেতে। একদিন এভাবেই বৃত্তের আবর্তে ঘুরে ঘুরে খুঁজে পান সেই মহেন্দ্র ক্ষণ—দেখেন, ঘুটঘুটে কালো জলে ভেসে আসছে সারি সারি দেহ। একইরকম দেখতে তারা—সবারই শরীর ভর্তি ক্ষত, মাথার চুল ছেঁটে ফেলা, নগ্ন শরীর, গায়ে ইউনিফর্ম। নিচু হয়ে মৃতচোখগুলোর দিকে তাকালেই ভ্রম হয়—সকলেই দেখতে অবিকল নীলের মতো, এরমাঝে তার নীল কই? অদূরে এক ওয়াশিং গার্মেন্টস—বুঝতে পারেন নীলরা সকলে সেখানকারই কর্মী। তাদের রক্তশূন্য শরীর তাকে মনে করিয়ে দেয় ১৯ বছর আগের এক স্মৃতি—ঘাঘটের জলে ভেসে যাওয়া তার মৃত মায়ের মুখ। তার নামহীন বাবার দেওয়া ধুতুরা ফুলের বিষে মায়ের সঙ্গে তারও মরে যাওয়ার কথা ছিল বহু আগেই। তবুও বেঁচে যান তিনি; যতটুকু সময় মাতৃগর্ভে থাকার কথা ছিল, তার অর্ধাংশেই জন্ম হয়ে যায় তার।

বাবাকে তো দেখেননি আর—দূর থেকে দেখেছেন শুধু তার বিশাল ঘর—বাবুবাড়ি। নানান কর্মযজ্ঞে ভরপুর এক দালানঘর—মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মা ছিলো সেখানকারই অদৃশ্য এক পরিচারিকা। সে দৃশ্যমান হতো কেবল গভীর রাতে, ঘুঙুর পায়ে, মন্দিরের চাতালে। মায়ের সেই ঘুঙুরজোড়াই তার জন্মপাপ—বাবুবাড়িতে তাদের নাম নেওয়াও ছিলো মানা। এখন এখানে এই বুড়িগঙ্গার তীরে বসে মনে হয়—সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই কারখানাটাই সেই বাবুবাড়ি, যার ভেতরে বসে আছে তার বাবা। তাকে তিনি কখনো দেখেননি, কিন্তু সে তার পরিচিত—এতটাই গভীর পরিচয় তাদের, যতটা হলে তাকে ধ্বংস করে ফেলতে ইচ্ছা হয়। আর অদূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এই কারখানাটা—আজ প্রথম দেখেও অচেনা নয় তার। নীলের চোখে তাকিয়ে তিনি দেখেছেন—এই কারখানা ভরা বিশাল সব যন্ত্র, প্রতিদিন হাজারো কাপড় গিলে নিয়ে উগরে দেয় তারা। আর সেই ওগরানো কাপড়ে আকিবুকি করে যায় তার নীল—লেজার আলোয় ক্ষতবিক্ষত দুই হাতে। এই কারখানাও ঠিক তার নামহীন বাপের মতোই—তার বহুদিনের পরিচিত—নীলের চোখের দিকে তাকালেই তিনি দেখতে পেতেন এর ঘরগুলো, এই ইউনিফর্ম, এই লেজার রশ্মি, চিৎকার, আগুন... প্রতিশোধই ছিল চিত্রাদির জীবনভর উদ্দেশ্য—নীলেরও তো তাই। যেই আক্রোশে তার বাবার বাড়িটা ছারখার করে দিয়েছে ঘাঘটের স্রোত—নীলও তো সেই আক্রোশেই জেগে থাকত রাতের পর রাত। একই ঘটনার চক্রে পাক খেয়ে যাচ্ছেন তিনি—তা এতদিনেও বুঝেননি—কীভাবে!

তিনি শবগুলো ছুঁতে থাকেন—মাঝের তরতাজা একটা দেহে হাত রাখতেই বুঝতে পারেন—এইতো তার নীল। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা ফিরে পায় তাদের বাস্তব মুখাবয়ব। নীলকে বুকে তুলে নিয়ে তিনি খুঁজতে থাকেন পালানোর পথ। কিছুদূর যেতেই দেখেন নদীর মাঝে ভাসতে থাকা নৌকা—মাঝি তার লাল কাপড়ে মুখ ঢাকা এক মেয়ে। যমুনায় যাবে নাকি বলতেই তুলে নেয় তাদের সে। যেতে হবে বহুদূর—দেরি করেন না তিনি।

যমুনায় নীলের সমাধি ও চক্রপূরণ

নৌকায় ভাসতে ভাসতে তারা পৌঁছে যান যমুনায়। সেখানে সমাধিস্থ করেন নীলকে। যেভাবে মা ভেসে গিয়েছিল ঘাঘটে সেভাবেই নীলকে আপন করে নেয় যমুনার জল। এরপর ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেন নৌকার গলুইতে। জল ছেড়েছে তার—তিনিও এখন যমুনায় তৈরি হওয়া এক ছোট নদী। অন্ধকারে মাঝির দিকে তাকান তিনি—দেখেন তার মুখ থেকে সরে গেছে লাল আবরণ—সেখানে অন্ধকার এক গহ্বর। নিবিড় মনে সে নৌকা চালাচ্ছে। তাকে বললেন, ‘ঘাঘটে নেবে আমাকে?’ সে মাথা নাড়ালো—শব্দ পায় ঝমঝম ঝমঝম। যে মৃতা নারীর গল্প শুনে শুনে বেঁচে ছিলেন এতদিন—বুঝতে পারেন সে-ই তার পাশে। তাকে ছুঁতে ইচ্ছা করে খুব। পারেন না—একই নৌকায় তবু বহুদূরে সে। অন্তত নিশ্চিন্ত হন—জানেন সে তাকে পৌঁছে দেবে গন্তব্যে।

প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করতে করতে যখন জেগে যান তখন মাঝরাত। পাশ ফিরে দেখেন—দেখতে পান—যমুনার পরিচিত পাড়ে, যেখানে এসে শুকিয়ে গিয়েছে ঘাঘট—সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা শুকনো গাছ; কিংবা এক নারী... চিত্রাদি। প্রবল পূর্ণিমা ঠেলে নৌকা ঘাটে ফেরে—সেখানে জন্ম নেয় তার সন্তান। চিত্রাদি বুকে তুলে নেয় তাকে—যমুনার জল ছুঁইয়ে করে নেয় পাপমুক্ত। ভাটির টানে দূরে সরে যেতে থাকে নৌকা—সেই সাথে তিনি, আর ঘুঙুর পড়া কালো নারী। এবার প্রবল জ্যোৎস্না তাকে নিয়ে যায় তার জন্মরাতে—মন্দির থেকে ভেসে আসে ঢাকঢোলের শব্দ—আর তার পায়ে সেই পুঁতে রাখা ঘুঙুর। দেখেন—বৈঠা হাতে লাল কাপড়ের মেয়েটি আর নেই—বৈঠাও আর নেই। তিনি বৃত্ত পূরণ করে মিলে গেছেন তার সাথে—এখন তার মতোই ভেসে যাচ্ছেন নিরুদ্দেশ। শেষ মুহূর্তে পিছে ফিরে তাকান—ঘাটে শুয়ে আছে তার কন্যা—দূর থেকেও ওর দুচোখে আগুনে নৃত্যরত মৃত্যু দেখা যায়—নিশ্চিন্ত হন তিনি। নীলের অসমাপ্ত বৃত্ত পূরণ করবে তাদের সন্তান। নৌকা বহুদূর চলে গেলে ফিরে চান আবারও—দেখেন—ঘাটে শুধু ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া এক শিমুল গাছ—জ্যোৎস্নার আলোয় জ্বলজ্বল করছে যার ফুলগুলো।