ক্যাতারজিনার বাড়িতে পোষা প্রাণীদের এক অপূর্ব জগৎ। গত বছর দেখা গিয়েছিল তিনটি পোষা বিড়াল। এ বছর সেখানে আরও চারটি বিড়াল যোগ হয়েছে। যোগ হয়েছে একটি ভদ্র কুকুর। তাকে ভদ্র বলার কারণ হলো, সে বুড়োবুড়ি কাউকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলে তাদের রাস্তা পার করিয়ে দেয় এবং সাথে সাথে অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে এগিয়ে দিয়ে আসে। তবে, কুকুর ও নতুন চার বিড়ালের ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারা বাইরে নিজেদের ঘরে থাকে। কুকুরের জন্য নির্দিষ্ট ঘর রয়েছে। আর বিড়ালদের জন্য ঝুড়ির ভেতর তোশক পেতে দেওয়া হয়েছে। তাদের নিয়মিত খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিড়ালদের আদর ও কুকুরের অনুপস্থিতি
গাড়ি বাড়ির ভেতর ঢুকতেই বাইরের বিড়ালগুলো ক্যাতারজিনার কাছে দৌড়ে এলো। তিনি গাড়ি থেকে নেমে তাদের নানাভাবে আদর করতে লাগলেন। পোলিশ ভাষায় কত যে আবেগঘন কথাবার্তা আর ভাব-বিনিময় চললো তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। বাচ্চা বিড়াল দুটোকে কোলে নিয়ে বারবার চুমু খেলেন। কিন্তু কুকুরটিকে কোথাও দেখা গেলো না। তিনি বললেন, “দুই কিলোমিটার দূরে একটি সিনিয়র সেন্টার আছে, সেখানে গেছে। আমি কিছুক্ষণ বাদে নিয়ে আসব।”
অতিথির অবস্থান ও ভ্রমণসূচি
এই বাড়ির গেস্টরুমটা আমার জন্য বরাদ্দ। গত বছর মোট দশদিন ছিলাম। এ বছর থাকবো পাঁচ সপ্তাহ। তবে এর ভেতর চেহানোভ-এ চারদিন কাটিয়ে এলাম। চারদিন কাটাবো চেক রিপাবলিকের ব্রানোভ শহরে, ২৬তম ব্রানোভ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে এবং নভেম্বরের ১২ থেকে ১৬ থাকবো পোলানিৎসা-স্দ্রুই শহরে। তাছাড়া তিনি আমাকে যে প্রোগ্রাম সূচি দেখালেন তাতে আরও দুই-একদিন বাইরে থাকতে হবে। ওদিকে চেহানোভ থেকে ফেরার পথে লেবিয়ডা বলে গেছেন আমরা যদি দুই-একদিন বিডগোসে তাঁর বাড়িতে যাই তিনি যারপরনাই খুশি হবেন।
ভেতরের বিড়ালদের সঙ্গে পুনর্মিলন
আমি লাগেজ নিয়ে আস্তে আস্তে রুমে রেখে এলাম। বাড়ির ভেতরের বিড়ালগুলো যে আমাকে ভুলে যায়নি তা তাদের ব্যবহারেই বোঝা গেলো। গান্দুস্কা ছুটে এসে আমার পায়ের কাছে দাঁড়ালো। ভাবখানা এমন যে সে বলতে যাচ্ছে, “এতদিন কোথায় ছিলেন?” আমার সাথে তার কত গল্প জমা হয়ে আছে। পিলুতা আর গান্দুস্কা সাধারণত একসাথে হাঁটে না। একটি অন্যটির কর্তৃত্ব এড়িয়ে চলে। তাই আমি যখন চা নিয়ে বসলাম তখন সময় বুঝে পিলুতা পায়ের কাছে এসে আদর চাইলো। ওদিকে আম্ব্রেলস্কা হলো এই তিনজনের সর্দার, বনের রাজা বলতে যা বোঝায়। সিংহের মতো আস্তে ধীরে পা ফেলে হাঁটে, একেবারে টেবিলের উপরে গিয়ে বসে সবকিছু পরখ করে। তাকে কেউ নাড়াচাড়া না দিলে সেও কাউকে বিরক্ত করে না। কিছুক্ষণ পরে তিনি এসে আমাকে কী যেন বলতে চাইলেন। আমি প্রথমে বললাম, “কী রে সব কিছু ভালো!” ও আরেকটু কাছে এসে আবার আমার পা শুঁকতে থাকলো, “মিয়াও করে কী যেন বলতে লাগলো।” কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। পরে দেখি সে টেবিলের উপরে উঠে আমার ল্যাপটপের আশে-পাশে ঘুরছে আর বারবার মাথা উঁচু করছে। আমি বুঝতে পারলাম টেবিলে তার নিয়মিত বসার জায়গায় আমি ল্যাপটপ রেখেছি। অতএব সেটা সরিয়ে নিলে সে শান্ত হয়ে সেখানে বসে পড়ল।
রাতের সিদ্ধান্ত ও লিছুর আগমন
রাতে আমরা কেউ কিছু খাব না বলেই সিদ্ধান্ত নিলাম। এমনিতে ভার্জিনিয়ার বাসায় যে পরিমাণ খাওয়া হয়েছে তাতে আমার মনে হয়েছিল যে আগামী তিনদিন না খেলেও চলবে। কিছুক্ষণ বাদে ক্যাতারজিনা বললেন, “আমি গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, লিছুকে নিয়ে আসি।” আমি ভাবলাম এখানে আবার নতুন কেউ থাকে কি না কে জানে। জিজ্ঞেস করলাম, “লিছু কে?” “তুমি দেখলে ওর প্রেমে পড়ে যাবে। হঠাৎ করেই একদিন আমার বাসায় হাজির। কোথা থেকে এলো কে জানে। কিন্তু খুব বুদ্ধিমান কুকুর!” দরজা ভিড়িয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন, “এই যাবো আর আসব।” মিনিট পনেরো পরে ক্যাতারজিনা ফিরেই হইচই বাঁধিয়ে দিলেন। আমি নিজের রুমে বই নিয়ে বসে ছিলাম। “কই তাড়াতাড়ি আসো, লিছুকে আদর করে যাও।” আমি বেরিয়ে আসতেই বাচ্চা একটি কুকুর আমার পায়ের কাছে এসে শুঁকতে থাকলো। লাফিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরার অবস্থা। তিনি বললেন, “ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দাও।” আমি বললাম, “কদিন আগে আমি মেসিডোনিয়ায় কুকুরের কামড় থেকে বেঁচে ফিরেছি!” “কী যে বলো, ওর চেয়ে ভালো কুকুর হয় নাকি!” “আস্তে আস্তে কাছে যেতে পারবো, চিন্তা করো না।” আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম। তিনি লিছুকে বাইরে নিয়ে খাবার দিলেন। ফিরে এলে বললাম, “লিছু কিন্তু একটি ফলের নাম, ইংরেজিতে লিচি!” তিনি বানান করে বোঝালেন, “এলআইএসইউ, লিছু। লিচি নয়। লিছু মানে শৃগাল কিংবা পাহারাদার, আমি ওর নাম রেখেছি লিছু। তবে ওর একটি লাস্ট নেমও আছে।” “সেটা আবার কী?” “আমার কুকুর বিড়াল প্রত্যেকের ফার্স্ট ও লাস্ট দুটো নামই আছে। লিছুর লাস্ট নেম গানকোভে।”
রাতের খাবার ও ঘুমের ব্যবস্থা
রাতে কিছু না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও আটটার দিকে ক্যাতারজিনা নিজের জন্য একটি স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলে বললাম যে আমার ক্ষুধা পেলে রুটি ফল কিছু একটা খেয়ে নেবো। সাধারণত ইউরোপে এলে রাত বারোটার দিকে আমার ক্ষুধা পায়। কারণ তখন নিউইয়র্কে সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। দীর্ঘদিন স্কুল থেকে ফিরে খাওয়ার যে অভ্যাস গড়ে উঠেছিল সেটা এখনো রয়ে গেছে। এ কথা শুনে ক্যাতারজিনা বললেন, “অত রাতে কে খায়!” “কিন্তু সেটা তো আমার জন্য সন্ধ্যা ছয়টা!” “তা ঠিক,” তিনি মেনে নিলেন, “তুমি জানো কোথায় কী আছে, ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিও।” তিনি দোতলায় ঘুমাতে যাবার আগে বললেন, “আজ রাতে আমি কিন্তু ফায়ারপ্লেসে আর আগুন জ্বালাবো না।” তিনি এখনো ফায়ারপ্লেস ব্যবহার করেন। এটা নাকি যেমন সাশ্রয়ী তেমন স্বাস্থ্যবান্ধব। আমি বললাম, “আমার কোনোই অসুবিধা নেই। লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকবো।” কিন্তু আমি তো জানি ঘুম আমার কাছ থেকে এখন কয়েকশ মাইল দূর দিয়ে চলা শুরু করেছে। এর একটা বিহিতও ক্যাতারজিনা করে দিয়েছেন। তিনি ভেষজ ডাক্তার। অতএব আমাকে তাঁর নিজের বানানো ড্রপ ও প্রাকৃতিক উপায়ে তারই পরিচিত আরেক ফার্মাসিস্টের তৈরি ম্যালাটোনিন দিয়ে বলেছেন ঘুমের আধাঘণ্টা আগে দুটি ম্যালাটোনিন ও বিছানায় যাবার সময়ে চার ড্রপ লিকুইড খেয়ে নিতে।



