ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইকোসাইডের অভিযোগ লেবাননের পরিবেশমন্ত্রীর
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইকোসাইড অভিযোগ লেবাননের

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশ বিনাশের অভিযোগ তুলেছেন লেবাননের পরিবেশমন্ত্রী তামারা এল জেইন। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালে চালানো আগ্রাসনের সময় লেবাননে প্রাকৃতিক সম্পদের যেসব ক্ষতি হয়েছে, তার বিবরণ–সংবলিত একটি প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি এ অভিযোগ তোলেন।

প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

বিস্তারিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ‘ভৌত ও পরিবেশগত’ দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে। তবে এবারের বসন্তে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার তোড়ের প্রভাব এ প্রতিবেদনে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে এখন একটি ভঙ্গুর ও অসম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। ইসরায়েলের সর্বশেষ আগ্রাসন থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষেরা যখন বিধ্বস্ত বাড়ি ও নিজেদের সম্প্রদায়ে ফিরছেন, তখনই ১০৬ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল কীভাবে গভীর পরিবেশগত বিপর্যয় ও অপরিহার্য বাস্তুতান্ত্রিক সেবার ক্ষতির শিকার হয়েছে, তা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্য

প্রতিবেদনের ভূমিকায় তামারা এল জেইন বলেন, ‘বনভূমি, কৃষিজমি, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, পানিসম্পদ ও বায়ুমানের যে ব্যাপক ও ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করা হয়েছে, তাকে অবশ্যই ইকোসাইড বা পরিবেশ বিনাশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর পরিণতি তাৎক্ষণিক ধ্বংসের চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী।’

লেবাননের পরিবেশমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা যে পরিবেশগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি, তা শুধু বাস্তুতান্ত্রিক নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা, সামাজিক কাঠামো ও জাতীয় স্থিতিশীলতার বিষয়।’

ক্ষতির পরিমাণ

লেবাননের বৈজ্ঞানিক গবেষণাবিষয়ক জাতীয় কাউন্সিল (সিএনআরএস-এল) এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় লেবাননে—চওড়া পাতার গাছ, পাইন, স্টোন পাইনসহ ৫ হাজার হেক্টর (প্রায় ১২ হাজার ৩৫০ একর) বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে, স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে ও ভূমিক্ষয় ঘটেছে।

ফসল, গবাদিপশুর খামার, বনজ সম্পদ, মৎস্য ও জলজ চাষের অবকাঠামোসহ ১১৮ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮৭ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের ভৌত কৃষিসম্পদ ধ্বংস হয়েছে।

ফসল কাটা ব্যাহত হওয়া ও ফলন কমে যাওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদনে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড) ক্ষতি হয়েছে।

৮১৪ হেক্টর জলপাইবাগান, ৬৩৭ হেক্টর লেবুজাতীয় ফলের বাগানসহ মোট ২ হাজার ১৫৪ হেক্টর (প্রায় ৫ হাজার ৩২০ একর) ফলের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। কলাবাগানেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

মাটিতে ফসফরাসের ঘনত্ব ১,৮৫৮ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিশেষত, দক্ষিণ লেবানন ও পূর্বের বেকা উপত্যকায় দূষণ সবচেয়ে বেশি।

হামলার এলাকার বাইরেও ব্যাপক বায়ুদূষণ ঘটানো হয়েছে। এতে ভাসমান কণা, সালফার অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ডাই–অক্সিন ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো বিষাক্ত যৌগ নির্গত হয়েছে।

গাজা কৌশলের পুনরাবৃত্তি

ইসরায়েলের সমালোচকদের কথায়, দেশটি বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ‘গাজা কৌশলের’ পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসামরিক জনগণকে বাস্তুচ্যুত করা, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকর্মীদের লক্ষ্য বানানো, গ্রামের পর গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়া, পানি সরবরাহের অবকাঠামো ধ্বংস করা ও সংবাদকর্মীদের হত্যা।

২০২৩ সালে ফিলিস্তিনের গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানকার ৩৮ থেকে ৪৮ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি ও কৃষিজমি ধ্বংস করে। জলপাইবাগান ও খামারগুলো ধ্বংস করা হয়। হামলার ফলে ভূগর্ভের পানি গোলাবারুদ ও বিষাক্ত পদার্থে দূষিত হয়। বাতাস ধোঁয়া ও ভাসমান কণায় দূষিত হয়ে পড়ে।

আর্থিক ক্ষতি ও পুনরুদ্ধার

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব মিলিয়ে লেবাননের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৮ বিলিয়ন পাউন্ড)। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ভৌত ক্ষতি, ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন ১১ বিলিয়ন ডলার।

‘লেবানন একা এ বোঝা বহন করতে পারে না। পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমরা আন্তর্জাতিক সংহতি ও সহযোগিতার আহ্বান জানাই। ক্ষতির ব্যাপকতা এবং পুনরুদ্ধারের ব্যয়ের বিষয়টি সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব দাবি করে,’ বলেন তামারা এল জেইন।

ইসরায়েলের বক্তব্য

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চালানো অভিযানের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে তাঁরা অবগত আছেন। তাঁর দাবি, ইসরায়েলের নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বাহিনী কাজ করে থাকে। বেসামরিক মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেই সব অভিযান পরিচালিত হয়।