গাজীপুরে সংরক্ষিত শালবনে অবৈধ বর্জ্য ভাগাড় নির্মাণ করছে সিটি করপোরেশন
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের শালবনের ভেতরে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। বন বিভাগের আপত্তি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই এ কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা পরিবেশ আইন ও বন সংরক্ষণ নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্মাণকাজের বর্তমান অবস্থা
গত সোমবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক ঘেঁষে শালবনের মধ্যে একটি ধানি জমিতে দুটি খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) মাটি খুঁড়ছে। প্রায় ২০ জন শ্রমিক মাটি স্তূপ করে রাখছেন। সাইট সুপারভাইজার ইফতি নামে এক তরুণ দাবি করেছেন, তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কাজ তদারক করছেন।
এসটিএস হলো বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য একত্র করে রাখার অস্থায়ী ভাগাড়, যেখান থেকে পরে তা স্থায়ী ভাগাড়ে নিয়ে ফেলা হয়। ১১ এপ্রিল থেকে উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ নির্মাণকাজ শুরু করেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন।
বন বিভাগের তীব্র প্রতিবাদ
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের ঢাকা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, “গায়ের জোরে উদ্যানের দেয়াল ভেঙে ময়লা ফেলার স্থাপনা নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ অপ্রত্যাশিত।”
তিনি আরও জানান, বন বিভাগের বাধা দেওয়ার পর সিটি করপোরেশন শত শত লোক জড়ো করে দেয়াল ভেঙে ভাগাড় নির্মাণের কাজ শুরু করে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে বন অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আইনগত জটিলতা ও পরিবেশগত উদ্বেগ
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান বন আইন-১৯২৭ সালের ২০ ধারায় ঘোষিত একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন অনুযায়ী, জাতীয় উদ্যানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা ও স্তূপ করা নিষিদ্ধ। উদ্যানের সীমানা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা স্থাপনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা দাবি করেন, যেখানে এসটিএস নির্মাণ করা হচ্ছে, তা ব্যক্তিমালিকানায় থাকা জমি। তবে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই জমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থান
পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক আরেফিন বাদল প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ আইন অনুযায়ী এসটিএস নির্মাণ করতে হলে পরিবেশগত ও অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন কোনো ধরনের ছাড়পত্র নেয়নি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “বনের ভেতরে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গা হলেও আমরা এসটিএস নির্মাণ না করার বিষয়ে প্রতিবেদনে পরামর্শ দিয়েছি।”
পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, বনের ভেতর এসটিএস নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে এ নির্মাণকাজ বন্ধ করে জিসিসিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) ২০২৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, গাজীপুরে দুই যুগে বনভূমি ও জলাশয় কমেছে দুই–তৃতীয়াংশ। ২০০০ সালে জেলায় বনভূমির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর; যা কমে ২০২৩ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টরে।
পূর্বের ঘটনা ও বর্তমান সংকট
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি জাতীয় উদ্যানের বাউপারা বিট এলাকায় রাতে বর্জ্য ফেলতে দেখে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়ি জব্দ করে বন বিভাগ। পরে আদালতে বর্জ্য না ফেলার অঙ্গীকার করে ময়লার গাড়িটি নিয়ে যায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় দিনে প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে করপোরেশন সংগ্রহ করতে পারে এক হাজার টনের মতো বর্জ্য। বাকিটা রাস্তাঘাটের আশপাশে ফেলা হয়, যা পরিবেশগত সংকটকে আরও তীব্র করছে।



