পাহাড়ের সবুজের মিছিল: রাঙামাটির বেগানাছড়ি গ্রামের ভিসিএফ বনের গল্প
পাহাড়ের সবুজের মিছিল: বেগানাছড়ি ভিসিএফ বনের গল্প

রাঙামাটির ডলুছড়ির মৌজা বনে সবুজের সমারোহ। শুষ্ক চৈত্র মাসেও সেই সবুজের কমতি নেই। কিন্তু পাহাড়ে সংরক্ষিত বনের চিত্র ভিন্ন। মিকেল চাকমার সঙ্গে চৈত্রের এক সকালে আমরা বেগানাছড়ি গ্রামে পৌঁছাই। সকালের সূর্য তখন তাপ ছড়াচ্ছিল। বেশ খানিকটা সমতল ধানখেত পার হয়ে বনের কাছাকাছি যেতেই গায়ে লাগতে শুরু করে শীতল হাওয়া। চারপাশে গাছ আর বাঁশের বনে আকাশ প্রায় দেখা যায় না। হাওয়ায় দুলছে বাঁশের পাতা। নাম না জানা পাখির ডাক, তক্ষকের পরিচিত শব্দও কানে আসে। বনের পথ দুর্গম করে তোলে বড় বড় পাথর। এই শুষ্ক মৌসুমেও ঝরনার নির্বিঘ্ন চলাচলে সেসব পাথরে শেওলা জমে আছে।

পাথরের গায়ে মানুষের চলাচলের পথরেখা

পাথরের গায়ে মানুষের চলাচলের পথরেখা স্পষ্ট। এ পথে অনভ্যস্ত পা মাঝেমধ্যে পিছলে যাচ্ছে। তবে কালোবরণ চাকমা, মমতা রানী চাকমারা দিব্যি হেঁটে যাচ্ছেন। এ পথ যেমন তাঁদের জন্য সহজ, এই শুষ্ক মৌসুমে বেগানাছড়ির কলকল প্রবাহও তাঁদের কাছে নতুন কিছু নয়। অথচ এ গ্রামে আসতে গিয়ে পর্যটকদের বড় আকর্ষণ শুভলং ঝরনায় দেখলাম এক ফোঁটা পানিও নেই। পর্যটকদের হতাশ মুখও দেখেছি। মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরের শুভলং পানিশূন্য, বেগানাছড়িতে প্রবাহ থাকে কীভাবে?

বনযাত্রায় সঙ্গী জুমচাষি কল্পরঞ্জন চাকমা

বনযাত্রায় আমাদের সঙ্গী জুমচাষি কল্পরঞ্জন চাকমার বরাতে জানতে পারি, এ ঝরনার পানি আসছে পাহাড়ের বন থেকে। সত্তর ছুঁই ছুঁই কল্পরঞ্জন বলেন, ‘বেগানাছড়িতে পানি নেই, এমন অবস্থা কোনো দিন দেখি নাই। বন আছে বলেই পানি আছে। গাছের শিকড় পানি ধরে রাখে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পার্বত্য জেলা রাঙামাটি শহর থেকে কাপ্তাই লেক আর আদি কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে যেতে হয় বরকল উপজেলার নদীর পাশঘেঁষা এই বেগানাছড়ি গ্রামে। এখানেই আছে এক ভিন্ন ধরনের বন। যার সঙ্গে এই ছড়ার আছে এক নিবিড় সম্পর্ক। বন, ছড়া আর সেগুলোর ওপর নির্ভর করা প্রায় শত পরিবারের গ্রামের মানুষ—এই ত্রয়ীর এক অদ্ভুত মিথস্ক্রিয়া বেগানাছড়ি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘ভিন্ন ধরনের’ বন পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে কয়েক শ

এই ‘ভিন্ন ধরনের’ বন পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে কয়েক শ। পাড়া বন, মৌজা রিজার্ভ, রিজাব, ভিসিএফ (ভিলেজ কমন ফরেস্ট)—নানা নামে ডাকা হয় এসব বনকে। পাহাড়ের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—সবখানেই আছে এমন বন।

এসব বনের ধরন কেন ভিন্ন? একেবারে নিজেদের প্রজ্ঞা আর চর্চায় পাহাড়ের মানুষ শত শত বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছেন এসব বন। এর ব্যবস্থাপনা আর নিয়ন্ত্রণ পাহাড়ের মানুষের হাতে। অথচ এসব মানুষ কখনো বনবিদ্যা পড়েননি, অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই। পাহাড়ে সরকার বা বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকা বন যখন উজাড় বা প্রায় উজাড়, তখন এসব বন টিকে আছে স্বকীয়তায়। দেশি-বিদেশি একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারের সংরক্ষিত বনের চেয়ে আকারে অনেক ছোট এসব বনে গাছ আর প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা বেশি।

ভিসিএফগুলো শত শত প্রজাতির গাছ আর প্রাণীর আবাসস্থল। এসব বন ধরে রেখেছে পানির উৎসস্থল, জোগান দেয় মানুষের খাবার। ধরে রাখে মাটির গাঁথুনি। স্থানীয় মানুষ এবং গবেষকেরা বলছেন, ভিসিএফ–সংলগ্ন এলাকার সমতলে বেশি ফসল ফলে। এ বনের গাছপালাগুলো দূষণে বিপর্যস্ত বায়ুকে পরিশুদ্ধ করে।

জলবায়ু ও পরিবেশবিদদের কথা, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের এই বনগুলো কার্বন নিঃসরণ রোধে নীরবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় অনন্য এসব বনের কথা কমই আসে। তবে বনবিদ্যার গবেষকেরা মনে করেন, বন সুরক্ষার এই চর্চা বিশ্বের কাছে উদাহরণ হতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন পরিচিতি

পার্বত্য চট্টগ্রামের এককালের ব্রিটিশ প্রশাসক আর এইচ স্নেইড হাচিনসন পাহাড়ের বনের এক অনুপম বর্ণনা দিয়েছিলেন। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন: ‘পুরো জেলার দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম। পাহাড় আর উপত্যকার মিশেলে ঘন বন আর সমৃদ্ধ সবুজ উদ্ভিদরাজি আলোছায়ার অপূর্ব ও বৈচিত্র্যময় খেলা সৃষ্টি করে। এই সৌন্দর্যকে প্রকৃত অর্থে উপভোগ করতে হলে প্রধান পর্বতশ্রেণিগুলোর চূড়া থেকে দেখা উচিত—সেখানে দৃষ্টিসীমাজুড়ে বিস্তৃত বন যেন এক অন্তহীন সবুজ সাগর, যার মহিমা অনন্য। উপত্যকার চাষাবাদ করা জমিগুলো এখানে-সেখানে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপের মতো লাগে—মৌসুমভেদে কখনো পান্না-সবুজ, কখনো সোনালি, আবার কখনো মাটিরঙা আবরণে ঢাকা। সমুদ্রের দিকে ধীরে বয়ে যাওয়া নদীগুলো কখনো তরল সোনার মতো ঝলমল করে, আবার কখনো আশপাশের সবকিছুর প্রতিবিম্ব ধারণ করে। এই সব মিলেই এক অবিস্মরণীয় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে।’

আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বন, ন্যাড়া পাহাড়ের সঙ্গে শতাব্দী–পুরোনো এই বর্ণনার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে একটা সময় ছিল যখন পাহাড়ের এসব বন ছিল পাহাড়ি মানুষের নিয়ন্ত্রণে। বনবাসী, বননির্ভর এসব মানুষ বনের কোনো বিভাজন বুঝতেন না। কিন্তু পাহাড়ে ব্রিটিশ শাসন কায়েমের পর ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টি হয়। তখন থেকেই শুরু হলো বনের বিভাজন। ১৮৭১ সালে পুরো পাহাড়ি বন ‘সরকারের বনভূমি’ হিসেবে আখ্যা পেল। পাহাড়ের বনের অন্তত চারটি ধরন সৃষ্টি হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ৫ হাজার ৯৩ বর্গমাইল। এর মধ্যে ১ হাজার ২৪৪ বর্গমাইল বা পাহাড়ের মোট আয়তনের ২৪ ভাগ নিয়ে আছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সেখানে মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। ৫৪ বর্গকিলোমিটারের বেশি রক্ষিত বনও বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। আর আছে ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের বেশি অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল।

ভিসিএফ ও এর ইতিহাস

ভিসিএফ বা মৌজা বন হলো এমন একটি বনব্যবস্থা, যা পুরোপুরি স্থানীয় মানুষ বা সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন নয়, আবার সরকারি বনও নয়। এ সম্পদ গ্রামের সবাই মিলে ব্যবহার করে এবং সংরক্ষণ করে। পাহাড়ের বনে সরকারি নিয়ন্ত্রণের আগে কোনটা বন, কোনটা জুমের ভূমি, কোনটা বসতভিটা, তা চিনে রাখার কোনো বিষয় ছিল না।

কিন্তু পাহাড়ের অবারিত বনে যখন এমন বিভাজন এল, পাহাড়ি মানুষ তাঁদের নিজেদের প্রয়োজনেই মৌজা বন বা ভিসিএফ সুরক্ষা শুরু করেন বলে মনে করেন চাকমা সার্কেলের প্রধান রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার ভিসিএফ সংরক্ষণের রীতি ও কায়দায় তারতম্য আগেও ছিল, এখনো আছে। তাই একটি বিশেষ বছরে কোনো ভিসিএফের উদ্ভাবন হয়েছে, এমন নয়। বনের ওপর ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরই নিজেদের সম্পদ সুরক্ষার তাগিদে বনবাসী মানুষ তাঁদের তৎপরতা জোরদার করেন। মৌজা বন বা ভিসিএফের ব্যবস্থাপনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজ আমলেই মৌজা বন সংরক্ষণে একধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।

ব্রিটিশ আমলেই এসব মৌজা বন বা পাড়া বনকে স্থানীয় হেডম্যানের অধীনে রেখে এর ব্যবস্থাপনা শুরু হয়। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আইনে এই রীতিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

রসকো বা রক্তফল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনেও এখন কম পাওয়া যায়। বেগানাছড়িতে পাওয়া গেল তার সন্ধান। টক–মিষ্টি এ ফলের স্বাদ অতুলনীয়। রক্তফলে ভিটামিন সি ও আয়রন রয়েছে পর্যাপ্ত।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অন্য এলাকা থেকে ভিন্ন। এখানে তিন সার্কেল প্রধান সরকারের হয়ে ভূমি রাজস্ব আদায় করেন। তিনটি সার্কেল হলো চাকমা সার্কেল (রাঙামাটি), বোমাং সার্কেল (বান্দরবান) এবং মং সার্কেল (খাগড়াছড়ি)। এসব সার্কেল প্রধানের অধীনে মৌজাপ্রধান বা হেডম্যানরা কাজ করেন। কয়েকটি পাড়া বা গ্রাম মিলে একটি মৌজা হয়। হেডম্যানের অধীনে পাড়াগুলোতে আবার থাকেন কারবারিরা। এখন কোনো কোনো মৌজার বনের নেতৃত্ব কারবারিদের অধীনেও আছে। আবার কোথাও কোথাও হেডম্যান ও কারবারি ছাড়াও এলাকার নেতৃস্থানীয় অনেকেই ভিসিএফের নেতৃত্বে আছেন। বর্তমানে এই ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে নারীদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। হেডম্যান, কারবারি বা অন্য যে-ই থাকুন, বনের মালিকানা কারও একার নয়।

ভিসিএফের ব্যবস্থাপনা

পার্বত্য চট্টগ্রামে ১১টি পাহাড়ি জাতিসত্তার প্রত্যেকের মধ্যেই মৌজাভিত্তিক বা পাড়াভিত্তিক বনের চর্চা আছে। চাকমারা একে ডাকেন রিজাব, সার্ভিস; মারমারা বলেন রিজা; বমরা বলেন ‘কুয়া রিজাব’। ভাষার ভিন্নতায় এ বনকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। তবে ব্যবস্থাপনার মধ্যে তেমন কোনো ভিন্নতা নেই। সেই ব্যবস্থাপনা বেশ কড়াকড়ি।

বনের মধ্যে প্রধান পানির উৎসে জুম চাষ করা যাবে না। পানির উৎস নষ্ট হয়, এমন কিছুই করা যাবে না। জুমখেত থেকে আগুন যাতে মৌজা বনে প্রবেশ না করতে পারে, তা তদারকির জন্য কমিটি রয়েছে। গ্রামের সব সদস্য মৌজা বনের ভেতর যেসব স্থানে অবৈধভাবে বাঁশগাছ কাটা যায়, সেসব স্থানে নিয়মিত পাহারা জোরদার রাখেন। মৌজা বন থেকে যেকোনো উদ্ভিদ কিংবা জলজ প্রাণী যেমন চিংড়ি, মাছ, কাঁকড়া, শামুক ইত্যাদি আহরণের সময় সতর্ক থাকতে হয়। ফুল ফোটা ও ফল ধরার সময় কিংবা জলজ প্রাণীর প্রজননের সময় আহরণ দুই থেকে তিন মাস বন্ধ থাকে।

বনের কোনো সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না, এমন নয়। বেগানাছড়ির কালোবরণ চাকমা বলেন, কারও ঘর তৈরি বা অন্যান্য প্রয়োজনে যদি গাছের বা বাঁশের দরকার হয়, তবে তা কমিটির অনুমতি নিয়ে কাটা যায়।

‘বন না থাকলে আমরাও নাই’

জাতীয়ভাবে সরবরাহের বিদ্যুৎ নেই বেগানাছড়িতে। গ্রামবাসী চলে সৌরবিদ্যুতের আলোয়। আর আছে ‘প্রাকৃতিক এসি’। এই এসির উৎস বেগানাছড়ির বনে থাকা নানা প্রজাতির গাছ আর পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা ঝরনা। মমতা রানী চাকমা একটি গাছ দেখিয়ে বলেন, ‘এটা হলো চাক্কাছোলা।’ পেটের ব্যথায় কাজে লাগে এ গাছ। কল্পরঞ্জন চাকমা জানালেন, মাস দুয়েক আগেই এ গাছের রস খেয়ে উপকার পেয়েছেন তিনি। এ গ্রামে ওষুধের দোকান নেই। কাছাকাছি এলাকাতেও নেই। বনবাসী মানুষের কাছে এ বন ওষুধের পাশাপাশি নানা খাবারের উৎসও বটে।

বেগানাছড়ির আয়তন মাত্র ৩০০ একর। গ্রামবাসী যাঁদের সঙ্গে কথা বললাম, তাঁরা জানেন না এ বনে কত জাতের গাছ আছে। শুধু জানেন, এ বন তাঁদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মমতা রানী চাকমা বলছিলেন, ‘বন না থাকলে আমরাও নাই।’

সরকারি বন উজাড় হয়, ভিসিএফ টিকে থাকে

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, বনে কত গাছ আছে, কত প্রাণী আছে, তা-ও জানেন না ভিসিএফ–সংলগ্ন বনবাসী মানুষ। কিন্তু তাঁদের প্রথাগত জ্ঞান আর ব্যবস্থাপনার ফলে এসব বন শত বছর ধরে টিকে আছে। ভিসিএফ নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় প্রাণ ও প্রজাতির বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে। এমন একটি গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিজবাহুজ্জামান। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ২০টি ভিসিএফ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মধ্যে এই বেগানাছড়িও ছিল। তিনি দেখিয়েছেন, এ বনে ১৬১ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এর মধ্যে বড় গাছ ৪৮, খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন উদ্ভিদ ৫৫, প্রাণী আছে ১২৬, পোকামাকড় ৫৬ এবং পাখি আছে ৫৩ প্রজাতির।

‘কমিউনিটি ম্যানেজড ফরেস্টস ল্যান্ডস্কেপ অব দ্য চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস: আ মডেল অব রেজিলিয়েন্ট রুরাল লাইভলিহুড সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি করা হয় ২০২০ সালে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে বনে সবচেয়ে কম সংখ্যায় উদ্ভিদ প্রজাতি পাওয়া গেছে, তার সংখ্যাও ৮০। আর সর্বোচ্চ উদ্ভিদ পাওয়া গেছে ২১৩টি।

অধ্যাপক খালেদ মিজবাহুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শত শত বছর ধরে টিকে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের বনগুলো আমাদের কাছে শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে আছে। এর প্রাণবৈচিত্র্য সত্যিই আশ্চর্য হওয়ার মতো। বাংলাদেশে যখন বন উজাড় প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা, তখন এই পাড়া বনগুলো ব্যতিক্রম। এগুলো সরকারি বন নয়, কোনো সংরক্ষিত বনও নয়। তবু শত শত বছর ধরে পাহাড়ের আদিবাসী মানুষ নিজেদের নিয়মে এই বনগুলো গড়ে তুলেছেন, রক্ষা করেছেন এবং আজও তা টিকে আছে।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের অন্তত পাঁচটি সংরক্ষিত বনের বেশির ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। খ্যাতনামা ওপেন জার্নাল অব ফরেস্ট্রি সাময়িকীতে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘ম্যানেজমেন্ট অব ভিলেজ কমন ফরেস্টস ইন দ্য চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ: হিস্টোরিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড কারেন্ট ইস্যুজ ইন টার্মস অব সাসটেইনেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণা। বাংলাদেশের গবেষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ও জাপানের গবেষক মাকাতো ইনিউ সেই গবেষণায় বান্দরবানের চারটি ভিসিএফ এবং সরকারের বনের তুলনা করেছেন। তাঁরা একটি ভিসিএফ থেকে মোট ৬০টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ১৬৩টি উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করেন। এর মধ্যে কিছু বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতিও ছিল। অব্যাহত বন উজাড় ও ভূমি অবক্ষয়ের কারণে সংরক্ষিত বন এবং শ্রেণিভুক্ত রাষ্ট্রীয় বনে সাধারণত এসব উদ্ভিদ ও প্রজাতি আর দেখা যায় না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক জসিমউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেড় দশক আগে গবেষণাটি করেছিলাম। এর মধ্যে সরকারি বনগুলোর অবস্থা আরও বিপন্ন হয়েছে। ভিসিএফগুলোর সব কটির অবস্থা ভালো নয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রাণবৈচিত্র্যে সরকারি বনের চেয়ে এসব বন এগিয়ে আছে।’

প্রগ্রেসিভ রাঙামাটি নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের কর্মসূচি পরিচালক মংহ্লা ম্যান্ট তাঁর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, দুই দশকে (২০০২ থেকে ২০২২) পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ শতাংশ বনভূমি বিলীন হয়ে গেছে।

একটা সময় ভিসিএফগুলো বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘তখন আমরা বলেছিলাম, এর ফলে এসব ভিসিএফ আর রক্ষা করা যাবে না। বন বিভাগের বনভূমি রক্ষায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা নেই। এ কারণে সরকারি বনের এই দুর্গতি।’

ভিসিএফেও কালো ছায়া, উদ্ধারের নতুন চেষ্টা

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন এবং পাহাড় উন্নয়নের নানা প্রকল্পের পাল্লায় পড়েছে কয়েক শতাব্দী ধরে। গবেষকদের মতে, বন ধ্বংসের নানা কারণের মধ্যে রয়েছে বনগুলোর ওপর প্রথাগত অধিকার নষ্ট করা, ১৯৫০-এর দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষাধিক পাহাড়িকে উচ্ছেদ করা, গত শতকের আশির দশকে সামরিক সরকারের আমলে অন্তত চার লাখ বাঙালিকে পাহাড়ে পুনর্বাসন, রাবার চাষ, কর্ণফুলী কাগজের মিলের জন্য বিশাল এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ হরণ ইত্যাদি। প্রথাগত মৌজা বনেও এর প্রভাব পড়েছে।

এমন একটি মৌজা বন হলো ডুলুছড়ি। বেগানাছড়ির পর রাঙামাটির সদর উপজেলার এই বনে গিয়ে তিনটি গ্রামের দেখা পাওয়া যায়। কাপ্তাই লেক ধরে গিয়ে অন্তত পৌনে এক ঘণ্টা পথ হেঁটে পৌঁছানো গেল এ বনে। প্রবেশমুখে থাকা ছড়ায় খুব বেশি পানি দেখা গেল না। বনের পথ ধরে এগোলে দেখা হয় সুজন তঞ্চঙ্গ্যা ও শ্যামল তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে। সুজন বলেন, ‘এ বনে আগে বড় বড় গাছ ছিল। তখন ছড়ায় পানিও ছিল যথেষ্ট। কিছু লোক বনের গাছ বিক্রি করেছিল বন কমিটির কথা উপেক্ষা করে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রায় ১০৫ একরের বনটির জন্য গ্রামবাসী সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে রক্ষা করতে হবে। তাই এখন আর বড় গাছ দূরে থাকুক, কোনো গাছ কাটতে গেলে কমিটির সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’

মৌজা বনের সুরক্ষার বিষয়টি বা এসব বনের গুরুত্ব নিয়ে নতুন ভাবনার শুরু গত শতকের শেষের দিকে। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় এর গুরুত্ব নিয়ে নানা গবেষণা এবং বন রক্ষার আন্দোলন শুরু করেন। অনেক স্থানে বহিরাগতদের হাতে চলে যাওয়া বন ও বনসম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। কিছু বেসরকারি সংগঠন এগিয়ে আসে। পুনর্গঠিত হয় ভিসিএফের কমিটিগুলো। আগে এসব কমিটিতে নারী সদস্য ছিলেন না। এখন কোনো কোনো এলাকায় অর্ধেকের বেশি আছেন নারী। মৌজা বা পাড়া বনগুলোকে সেই সময় থেকেই ভিসিএফ নামে অভিহিত করা শুরু হয়।

এখন তিন জেলায় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এসব বনের ব্যবস্থাপনায় কাজ শুরু করেছে। এ কাজে সহায়তা করছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। তবে সব বনে তাদের কাজ নেই। আসলে কত মৌজা বন পাহাড়ে আছে, এর যথাযথ হিসাব এখনো নেই। কিন্তু যেসব বন এখন সমস্যায় আছে, সেগুলোর দিকেই বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইউএনডিপি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ভিসিএফসংক্রান্ত প্রকল্পের ফোকাল পারসন অরুনেন্দু ত্রিপুরা। তিনি বলেন, ভিসিএফের সম্প্রসারণে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আসলে এ বনের ব্যবস্থাপনা পাহাড়ি মানুষের রক্তের মধ্যে আছে। পাহাড়ের প্রকৃতি সজীব রাখতে ভিসিএফের সজীবতা অপরিহার্য।

১৯৯০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধিমালার ৪১ ধারায় এসব বনের অস্তিত্বের কথা বলা আছে। ১৯৬৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের বিশেষ নির্দেশও জারি হয় এ বন নিয়ে।

এসব বনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মালিকানা কারও একক নয়, যৌথ। মৌজার হেডম্যান রয়েছেন এর প্রধান হিসেবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় নারীদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

জলবায়ু পরিবর্তন, সুরক্ষার উদাহরণ হতে পারে ভিসিএফ

পাহাড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে ভিসিএফগুলো খুব সুরক্ষিত নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুয়াম লিয়ান আমলাই বলেন, অনেক ভিসিএফ হুমকির মধ্যে আছে। তাই ভিসিএফের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সুরক্ষার প্রশ্নটিও সামনে আসছে। সেই ব্যবস্থাপনায় অনেক ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে এনজিওগুলো।

এমডিপিআই প্রকাশনা থেকে ‘ফরেস্ট রেস্টোরেশন থ্রু ভিলেজ কমন ফরেস্টস ইন দ্য চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ: দ্য রোল অব এনজিও ইন্টারভেনশনস’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। সেখানে দেখানো হয়েছে, যেসব ভিসিএফ এনজিওর সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর উদ্ভিদের অবস্থা ও গাছের বৈচিত্র্য এনজিও-সহায়তাবিহীন ভিসিএফের তুলনায় ভালো। এ গবেষণার সুপারিশের মধ্যে রয়েছে ভিসিএফ ব্যবস্থাপনায় এনজিওদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো, আরও সমন্বিত ও বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার, ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান, বনজ বাস্তুতন্ত্রের সেবার জন্য বাজার গড়ে তোলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বিজ্ঞানভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

তবে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুপ্রিয় চাকমা বলেন, ভিসিএফগুলো যেন কুমিরের ছানা না হয়ে যায়। এর সহজাত বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বজায় রাখা দরকার।

অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকা বনগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যদিও ভিসিএফের পরিচিতি এখন সরকারি দলিলে কিছু আসছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে করা জাতীয় বননীতিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামবনসহ (ভিলেজ কমন ফরেস্ট) দেশের অনন্য সফল অংশীদারিমূলক বনায়নের রূপরেখার আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বনের দুরবস্থার চিত্র যখন প্রকট, তখন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভিসিএফের সুকৃতি বৈশ্বিক পরিসরে পরিচিত নয় বলেই মনে করেন রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি বলেন, প্রথাগত জ্ঞানের মাধ্যমে পরিচালিত এ বন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।

বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এ বনের অস্তিত্বের কথা কতটুকু জানিয়েছে বাংলাদেশ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ্‌। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বলছি না কার্বন বাণিজ্য বা জলবায়ুসংক্রান্ত তহবিল জোগাড়ে এসব বন আমাদের উপকরণ হোক। কিন্তু এসব বন বাংলাদেশে আছে, কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে আছে—জলবায়ুসংক্রান্ত আলোচনায় তার উপস্থিতি দেখিনি। এই কুণ্ঠাবোধ আমাদের জন্য সুখকর নয়।’