আইএমএফ ঋণের শর্তে জনগণ আর্থিক চাপে জিম্মি: তিতুমীর
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অভিযোগ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্তে নেওয়া ঋণের কারণে দেশের মানুষ এখন এক ধরনের আর্থিক চাপে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তিনি শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
আগের সরকারের সমালোচনা
তিতুমীর অভিযোগ করেন যে, আগের সরকার জনগণের কথা বিবেচনা না করে স্বজনতোষী পৃষ্ঠপোষকতা টিকিয়ে রাখতে এই বেইলআউট নিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি একটি সংকটাপন্ন অবস্থায় রেখে গেছে আগের সরকার।’ তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, যা কোনো নীতিগত সংস্কারের ফল নয়, বরং প্রবাসীদের দেশপ্রেম ও শ্রমের অবদান।
সরকারের অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জ
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের পাঁচটি প্রধান অগ্রাধিকার হলো:
- রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংস্কার
- সমতাভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন
- ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন
- আঞ্চলিক সমতা ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করা
- প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করা
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না।’ তাই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে তিনি রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতামত
সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
- অতীতের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা
- আইএমএফের শর্ত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা
- জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা
তিনি বলেন, দেশে আয় বৈষম্য উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০১০ সালে ধনী-দরিদ্র আয়ের ব্যবধান ছিল ৩২ গুণ, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ গুণে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যাংকিং ও শিল্পখাতের সমস্যা
ব্যাংকিং খাত নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেবল ঋণ পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’ ও ‘ঋণ ফাঁদ’ এর ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে ঋণের সুদ পরিশোধ বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় খাতে পরিণত হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা আনতে আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বন্ধ করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে শিল্পনীতি অন্তত পাঁচ বছরের জন্য স্থায়ী করা প্রয়োজন।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি সংকট নিরসনে সোলার প্যানেল কার্যকর হতে পারে। তবে করনীতি ও ব্যবসায়িক সীমাবদ্ধতার কারণে এই খাত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না।
ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রসঙ্গে
ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আইনে সবার জন্য সুযোগ রাখা হয়েছে। কারও কাছে আইনটি সংবিধানবিরোধী মনে হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।



