ছবি: লেখকের সৌজন্যে
এক সংগ্রামী নারীর গল্প
‘মা এমন একজন মানুষ, যিনি পৃথিবীর সবার জায়গা নিতে পারেন, কিন্তু তাঁর জায়গা কেউ নিতে পারে না।’— ইংরেজি সাহিত্যের এই বিখ্যাত উক্তি যেন প্রতিটি মানুষের জীবনের নীরব সত্য।
জীবনের নানা পর্যায়ে অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে আসি। শৈশবের বন্ধু, কৈশোরের সঙ্গী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, কিংবা কর্মজীবনের সহকর্মী—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়, পুরোনো সম্পর্ক রূপ বদলায়। তবু একটি সম্পর্ক কখনোই প্রতিস্থাপিত হয় না—মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক। সম্পর্কের এই রসায়নে সময়, স্থান বা পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন এলেও মাতৃত্বের ভালোবাসা একইভাবে স্থির, গভীর ও নিঃস্বার্থ থেকে যায়। তাই দিন শেষে পৃথিবীর সব সম্পর্কের ভিড়েও আমাদের উচ্চারণ একটাই—‘আমার মা’।
অভাবের সংসারে অদম্য মা
স্বল্প আয়ের একটি পরিবারে বড় হওয়া আমাদের গল্প অনেকের মতোই সাধারণ, আবার একই সঙ্গে অসাধারণও। বাবার অনুপস্থিতি ও অসুস্থতা, আর ছয় ভাইবোনের একটি পরিবার—সবকিছুর ভার একাই বহন করেছেন মা। এটি জীবন্ত এক সংগ্রামী নারীর বাস্তব গল্প। যখন পৃথিবীকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই দেখেছি, আমাদের জীবনের প্রতিটি দায়, প্রতিটি সংগ্রাম, প্রতিটি অভাবের ভার তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একদিকে প্যারালাইজড বাবার চিকিৎসা ব্যয়, অন্যদিকে ছয় সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব—এই দুই বিপরীত চাপের মধ্যেও তিনি কখনো নুয়ে পড়েননি।
শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হননি কেউ
চার ভাইবোন একই সঙ্গে পড়াশোনা করছিলাম আমরা। বড় ভাই অনেক আগেই পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু আমাদের পড়াশোনা এক দিনের জন্যও থেমে যায়নি। বই, খাতা, পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছু ঠিক সময়েই আমাদের হাতে এসেছে। আর এর পেছনে ছিলেন শুধু একজন—আমার মা। অভাবের সংসারে তিনি ছিলেন এক অদৃশ্য উদ্যোক্তা। বাড়ির আশপাশের জমিতে কৃষিকাজের উদ্যোগ নিতেন, উৎপাদিত পণ্য নিজেরাই ব্যবহার করতেন এবং অতিরিক্ত অংশ বাজারে বিক্রি করতেন। এই সীমিত আয়ের ভেতরেই তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতেন। কখনো মনে হয়, দারিদ্র্য বিমোচনের যে কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব তাঁর জীবনের বাস্তবতার কাছে যেন ছোট হয়ে যায়।
দুঃসময়েও অটল মা
সময় এগিয়েছে। একে একে দাদি এবং বাবাকে হারিয়ে পরিবার যখন আরও ভেঙে পড়ে, তখনো তিনি ভেঙে পড়েননি। সেই অন্ধকার সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র শক্তি। শৈশবের দিনগুলোয় কখনো পড়াশোনার ঘাটতি হয়নি, কখনো উৎসব উপলক্ষে আনন্দের অভাব হয়নি। অভাবের সংসারেও তিনি এমনভাবে সবকিছু সামলাতেন, আমরা কখনো টেরই পাইনি আমাদের সীমাবদ্ধতা কতটা গভীর ছিল। ঈদ, পালাপার্বণে যাতে সন্তানদের মন খারাপ না হয়, কীভাবে যেন সবকিছুর আয়োজন করে রাখতেন। গাছে তালের দিকে তাকিয়েই কয়েক রকম সুস্বাদু পিঠার কথা কল্পনা করতে পারতাম। নারকেলগাছে ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই নারকেলের তৈরি হরেক রকম পিঠা আর তরকারির পরিকল্পনা করে ফেলতেন মা।
আরও পড়ুন
আম্মুর সঙ্গে এক সৃজনসন্ধ্যা
৪১ মিনিট আগে
যে ঋতুতে গাছে পেয়ারা বা কাঁঠাল কম আসত, সে সময়ে নানার বাড়ি থেকে জোগান আনতেন মা। তারপরও সন্তানদের ভাগে কম ফেলতেন না তিনি। মৌসুমি ফল শুকিয়ে সংরক্ষণ, আচার তৈরি, পুকুরের মাছ, গরুর দুধ—সবকিছু দিয়েই তিনি আমাদের জীবনে একধরনের পরিপূর্ণতা তৈরি করতেন। কিন্তু শুধু ভরণপোষণই নয়, জীবনের নৈতিক ভিত্তিও তিনিই গড়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন অসংখ্যবার শোনানো ন্যায়নীতি, শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা আজও আমাদের পথ দেখায়। তিনি কঠোর ছিলেন অনিয়মের প্রতি, একই সঙ্গে ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রতিচ্ছবি।
৮০ বছর বয়সেও অক্লান্ত মা
আজ ৮০ বছর বয়সেও তাঁর জীবন যেন থেমে নেই। নিজের সুখ–সুবিধার কথা নয়, এখনো তিনি ভাবেন আশপাশের মানুষের কষ্ট নিয়ে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা নিয়ে। নিজের জন্য তাঁর কোনো চাওয়া আছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে পাই না। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক কখনো পুরোনো হয় না। বয়স বাড়ে, জীবন বদলায়, দূরত্ব তৈরি হয়—তবু অনুভূতি একই থাকে। আজও বাড়ি থেকে ঢাকায় আসার সময় কিংবা মায়ের ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় সেই একই অদৃশ্য টান অনুভব করি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। এই অনুভূতিই অপ্রকাশিত, অসংজ্ঞায়িত।
সাহিত্যের পাতায় মায়ের ছায়া
আমাদের প্রত্যেকের মানসপটে মায়ের জন্য এমনই কিছু অনুভূতি থাকে, যা হয়তো ম্যাক্সিম গোর্কির জগদ্বিখ্যাত ‘মা’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগ্রামী ‘জননী’, আনিসুল হকের মুক্তির সংগ্রামের বিসর্জনের প্রতীক ‘মা’, কিংবা রবীন্দ্রনাথ ও বিভূতিভূষণের সাহিত্যেও পুরোপুরি ধরা পড়ে না। কারণ, নিজের মাকে নিয়ে অনুভূতি সব সময়ই ব্যক্তিগত, অনন্য এবং অপূর্ণ ভাষার।
সহসভাপতি, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ
ফিচার থেকে আরও পড়ুন
জীবনযাপন
বন্ধুসভা ফিচার
মা দিবস



