বাংলাদেশের আর পাঁচজন গৃহিণীর মতোই আমার আম্মু। সব সময় ঘরের কাজে ব্যস্ত। নজর ঘরের প্রতিটি কোনায়, বাজারের তালিকায়, রান্নার সরঞ্জামে, আর প্রত্যেকের স্বাস্থ্যে। তবে দুটি জিনিস আম্মুকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে। প্রথমটি হলো তাঁর অদম্য মানসিক শক্তি আর লেগে থাকার মানসিকতা। দ্বিতীয়টি হলো আমার লেখাপড়া আর গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা।
প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা
গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আম্মুর নেই। কিন্তু লেখাপড়ার গুরুত্ব যতটা গভীরভাবে তাঁকে উপলব্ধি করতে দেখেছি, এবং ধারাবাহিকভাবে তার জন্য যতটা প্রাণ দিয়ে কাজ করতে দেখেছি, খুব কম মানুষের মধ্যেই সেটা আমি দেখেছি, সেটাই আমাকে ভেতর থেকে গড়ে তুলেছে। আমার চিন্তার কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করেছে।
চিকুনগুনিয়ার মহামারির সময় মায়ের অনন্য দৃষ্টান্ত
প্রায় এক দশক আগের কথা। বাংলাদেশে তখন চিকুনগুনিয়ার মহামারি। আমার ১০১ ডিগ্রি জ্বর। আম্মুর ১০৩। আব্বু ও ছোট ভাইয়েরও তীব্র জ্বর। কিন্তু আমার সেমিস্টার ফাইনাল। ঘরের সবাই বিছানায় আটকা। কিন্তু এত ঝামেলার মধ্যেও আম্মু হাসিমুখে একাই তিন বেলা রান্না, কোটাবাছা, পরিষ্কার করে যাচ্ছিলেন। বারবার তাঁর মুখে এক কথা, পরীক্ষায় যেন কোনো অসুবিধা না হয়। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এই ধরনের ঘটনা প্রায় সব বাসাতেই হয়, কিন্তু মায়েদের প্রাপ্য ক্রেডিট নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না।
স্বপ্ন পূরণে মায়ের আর্থিক সহায়তা
আরেকটি ঘটনা। সময়টা ২০১৯। সবে বুয়েট থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছি। তখনো চাকরিতে ঢুকিনি, কারণ লক্ষ্য উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আসা। কিন্তু সে জন্য জিআরই ও টোয়েফল দিতে হতো। হাতে টাকা নেই। আমার জন্য এই পরীক্ষাগুলোও বেশ ব্যয়বহুল। সে সময় আম্মুর সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু দিয়ে পরীক্ষা আর ভিসা ফির ব্যবস্থা হয়েছিল। এ ধরনের ছোট ছোট ঘটনা ভুলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু এগুলো না ঘটলে জীবন হয়তো একদমই অন্যদিকে মোড় নিত।
একাডেমিক সাফল্যের পেছনে মায়ের ভূমিকা
আমার বর্তমান একাডেমিক অবস্থানের পেছনে আম্মুর অবদান সর্বোচ্চ। কেননা প্রথম কয়েকটা বছর ছাত্র হিসেবে গড়পড়তা ছিলাম। কিন্তু আমি শিখেছি, লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে মেধাবী মানুষটা হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করা আর নিজেকে সঠিক জায়গায় রাখা। ঠিক এই ক্ষেত্রেই আম্মু আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন, টের পেয়েছি যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর। আম্মু সব সময় সবচেয়ে ভালো বিশ্লেষণ করতে পারত—কোথায় আমার শক্তি, কোথায় দুর্বলতা, কোন শিক্ষক আমার দরকার, এমনকি কোন লেখকের বই আমার জন্য ভালো। এসবের ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে প্রতিটি সিদ্ধান্ত থেকে সেরা ফলটা যেন আমি পাই, আম্মুই তা নিশ্চিত করেছে।
আইভি লিগে পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণা
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্প্রতি পিএইচডি শেষ করেছি। আমেরিকার সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আটটি আইভি লিগ প্রতিষ্ঠানের একটি ব্রাউন। বর্তমানে আরেকটি আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয় ডার্টমাউথ কলেজে পোস্টডক্টরাল রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছি। আমার আজকের এই অবস্থানকে যদি একটি ভবনের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বলব, প্রতিটি ইটের গাঁথুনি আমার আম্মুর দেওয়া। ৩০ বছর ধরে খুব ভোরে উঠে আম্মু যে তাঁর দিন শুরু করেন, এই সাজানো–গোছানো ভবন তারই প্রতিফলন।
মা দিবসে প্রত্যেক মাকে শ্রদ্ধা জানাই, যাঁদের প্রতিদিনের জীবন একেকটি যুদ্ধ। তবু তাঁরা হাসিমুখে সেই যুদ্ধ জয় করেন, বাড়ির সবাইকে আগলে রাখেন।



