প্রজন্মের মা: সংগ্রাম, ভালোবাসা ও অধিকারের গল্প
প্রজন্মের মা: সংগ্রাম, ভালোবাসা ও অধিকার

একসময় মায়েদের জীবন মানেই ছিল সংসার, সন্তান আর আত্মত্যাগের এক নীরব অধ্যায়। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, বদলেছে পরিবারের কাঠামোও। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত- প্রতিটি প্রজন্মের মা তার নিজের সময়ের সঙ্গে লড়াই করে সন্তানকে আগলে রেখেছেন। শুধু লড়াইয়ের ধরন বদলেছে। সবসময়ই তাকে কেউ একজন কানে কানে বা চিৎকার দিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে বলতে থেকেছে- মায়েদের সব মেনে নিতে হয়, মাকেই তো ছাড় দিতে হবে, মায়ের চাওয়া পাওয়া থাকলেও বলতে নেই। কিন্তু শক্ত স্বরে এ সমাজকে এটা বলতে শোনা যায় না- মা হয়েছে বলেই ব্যক্তি অধিকার ক্ষুন্ন হতে পারে না।

আশির দশকের মায়েরা

আশির দশকের মায়েদের কথা ভাবলে চোখে ভেসে ওঠে এক অনবরত ব্যস্ত নারীর ছবি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রান্না, কাপড় ধোয়া, অতিথি সামলানো, পরিবারের সবার চাহিদা পূরণ- সবকিছুই ছিল তাদের দায়িত্ব। তখন বেশিরভাগ পরিবার ছিল যৌথ। সংসারে লোক বেশি, কাজও বেশি। কিন্তু সেই মায়েরা নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ক্লান্তিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। সন্তানদের মানুষ করাই ছিল তাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। নিজের জন্য আলাদা কোনও সময় বা পরিচয় দাবি করাটা তখন অনেকের কাছেই বিলাসিতা ছিল।

নব্বই দশকের পরিবর্তন

নব্বইয়ের দশকে এসে সমাজে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। একক পরিবার বাড়তে থাকে। শহরমুখী জীবন, চাকরির চাপ, সীমিত পরিসরের সংসার - সব মিলিয়ে মায়েদের দায়িত্বের ধরন পাল্টে যায়। আগে যেখানে সংসারের কাজে ভাগাভাগি করার মতো মানুষ থাকত, সেখানে এখন একজন মাকেই একা সামলাতে হয়েছে প্রায় সবকিছু। সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনও বদলাতে শুরু করে। শুধু শাসন নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। পড়াশোনা, মানসিক বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা—সবদিকে সন্তানের পাশে থাকার চাপও বেড়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমান সময়ের মায়েরা

বর্তমান সময়ের মায়েদের জীবন যেন আরও বহুমাত্রিক। সকালে সন্তানের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, স্কুলগেটের উদ্বেগ, তারপর দ্রুত অফিসে ছোটা- এই বাস্তবতা এখন বহু মায়ের প্রতিদিনের গল্প। অফিস শেষে আবার বাসায় ফিরে সংসার সামলানো, সন্তানের পড়াশোনা দেখা, অনলাইন জগতের ঝুঁকি থেকে সন্তানকে নিরাপদ রাখা—সবকিছুই একসঙ্গে করতে হচ্ছে তাদের। প্রযুক্তির এই যুগে সন্তানকে শুধু বড় করাই নয়, তাকে নিরাপদ ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখাটাও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাবাদের অংশগ্রহণ ও সামাজিক প্রত্যাশা

নিশ্চয়ই আজকের বাবারা আগের চেয়ে অনেক বেশি অংশ নিচ্ছেন সন্তান পালন ও ঘরের কাজে। তবু সমাজ এখনও মায়ের কাছেই নিখুঁত হওয়ার প্রত্যাশা রাখে। সন্তান অসুস্থ হলে প্রথম প্রশ্ন ওঠে মায়ের দিকে, সন্তানের ফল খারাপ হলেও দায়টা এসে পড়ে তার ওপরই। প্রজন্ম বদলেছে, জীবনযুদ্ধের ধরন বদলেছে, কিন্তু মায়েদের স্বতস্ফূর্ত বা চাপিয়ে দেওয়া ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ বদলায়নি। শুধু প্রতিটি সময় তাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এনে দাঁড় করিয়েছে। আর প্রতিটি প্রজন্মের মা নিজের মতো করে সেই লড়াই লড়ে গেছেন নীরবে, নিরন্তর। কিন্তু এই মায়েদের পাশে আস্থা হয়ে কি দাঁড়াতে পারছে সন্তান? জীবনের কাঠামোর কারণে বড় একটা সময় নিজ শহরের বাইরে, দেশের বাইরে কাটাতে হয় সন্তনদের। নিজেকে উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে গিয়ে কখন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তা হয়তো বুঝতেই পারে না। ফলে যে মা সন্তানকে কেন্দ্র করে জীবন কাটাতে গিয়ে জীবন থেকে অনেক আকাঙক্ষা ছেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছে, সে মাকে সন্তান সারাজীবন ভরসার জায়গায় রাখলেও, একবার ভেবে দেখেছেন কি- এই মায়ের আস্থার জায়গা সন্তান হয়ে উঠছেন কিনা। কন্যা- জায়া- জননী আকারে তার দায়িত্ব পালনটাই সমাজ বারবার মনে করিয়ে দিলেও তার প্রতি কারোর কর্তব্য নিয়ে আলাপ হয় না বললেই চলে।

মিডিয়ার ভূমিকা

এই স্টেরিওটাইপ ভাঙতে মিডিয়াকে প্রথমেই মায়েদের “অলৌকিক সুপারহিউম্যান” নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। এমন গল্প বলা বাড়াতে হবে যেখানে মা শুধু সন্তানের জন্য আত্মত্যাগী চরিত্র নন, বরং তাঁর নিজস্ব স্বপ্ন, হতাশা, একাকীত্ব, মানসিক চাপ ও ব্যক্তিগত পরিচয়ও আছে। একইসঙ্গে সন্তানের দায়িত্ববোধ, বাবা বা পরিবারের সমান অংশগ্রহণ এবং বৃদ্ধ বয়সে মায়ের মানসিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও সামনে আনা জরুরি।

গণমাধ্যমের কর্তব্য

গণমাধ্যম চাইলে এই আলোচনাকে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে। এটা তার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কর্মজীবী মায়েদের অদৃশ্য শ্রম, তার পুরো সমাজের চোখে “পারফেক্ট মা” হওয়ার চেষ্টা থেকে তৈরী হওয়া সামাজিক চাপ, কিংবা সন্তান বড় হয়ে দূরে চলে যাওয়ার পর মায়েদের নিঃসঙ্গতার গল্প যেন অজানা থেকে না যায়। শুধু আবেগ নয়, সম্পর্কের পারস্পরিক দায়িত্ব নিয়েও আলাপ বাড়ানো দরকার। কারণ মা শুধু দায়িত্ব দেওয়ার মানুষ নন, তিনিও আস্থা, সময়, যত্ন ও মানসিক সহচরিতা পাওয়ার অধিকার রাখেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিডিয়া যদি বারবার দেখাতে শুরু করে যে একজন মায়ের জীবন শুধু “কন্যা-জায়া-জননী” পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি - তাহলেই ধীরে ধীরে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করবে। সময় লাগবে, কিন্তু বদলাবে।