প্রিমো লেভি: একজন রসায়নবিদ থেকে হলোকাস্ট লেখক
প্রিমো লেভি ছিলেন ইতালির অন্যতম খ্যাতিমান লেখক, যিনি ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং কবি হিসাবে পরিচিত। তবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল রসায়নবিদ হিসাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আউশভিৎস বন্দি শিবির থেকে বেঁচে ফেরার পর তিনি তাঁর ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন, যা ১৯৪৭ সালে ইতালীয় ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫৯ সালে ইংরেজি অনুবাদ ইফ দিস ইজ অ্যা ম্যান প্রকাশের পর তাঁর নাম বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি আউশভিৎসের মুখ্য বিবরণদাতা হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন।
জীবন ও সাহিত্যকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
প্রিমো লেভি ১৯১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি ইতালির তুরিন শহরের এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মুসোলিনির অ্যান্টিসেমিটিজম আইন সত্ত্বেও তিনি ১৯৪১ সালে তুরিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালে জার্মান সৈন্যরা ইতালি আক্রমণ করলে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী দলে যোগ দিতে পাহাড়ে পালিয়ে যান, কিন্তু ধরা পড়ে দক্ষিণ পোল্যান্ডের আউশভিৎস বন্দি শিবিরে নির্বাসিত হন। আট মাস বন্দি থাকার পর রসায়নবিদ হিসাবে তাঁর দক্ষতার কারণে তাঁকে একটি সিন্থেটিক রাবার কারখানায় কাজে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত লাল ফৌজের হাতে শিবির মুক্ত হলে তিনি তুরিনে ফিরে আসেন।
যুদ্ধের পর লেভি তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইফ দিস ইজ অ্যা ম্যান (১৯৪৭) এবং দ্য ট্রুস (১৯৬৩) নামে দুটি ক্লাসিক আত্মজীবনীতে রূপ নেয়। এই গ্রন্থগুলো বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং স্কুল-কলেজে পাঠ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তিনি দ্য পিরিয়ডিক টেবিল, দ্য ড্রাউন্ড অ্যান্ড দ্য সেভড সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসিত।
মৃত্যুর রহস্যময় পরিস্থিতি
প্রিমো লেভি ১৯৮৭ সালের ১১ এপ্রিল তুরিন শহরের নিজের তিন তলা অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যান। সরকারি তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসাবে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা এটিকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করেন। মৃত্যুর দিন সকালে দারোয়ান ইওলান্ডা গ্যাসপেরি তাঁর কাছে চিঠি ও সংবাদপত্র দিয়েছিলেন, যেখানে লেভিকে ক্লান্ত দেখালেও অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ইওলান্ডা দৌড়ে গিয়ে লেভির মৃতদেহ দেখতে পান।
স্ত্রী লুসিয়া মোরপুরগো এবং ছেলে রেঞ্জো ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেন। পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারীরা মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে তাত্ক্ষণিক মৃত্যু নিশ্চিত করেন এবং রেডিওতে আত্মহত্যার খবর প্রচার করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আজও চলমান।
মৃত্যুর পেছনের সম্ভাব্য কারণ
প্রিমো লেভির মৃত্যু নিয়ে দুটি প্রধান মতবাদ রয়েছে: আত্মহত্যা এবং দুর্ঘটনা। আত্মহত্যার পক্ষের যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:
- লেভি জীবনের শেষ পর্যায়ে গভীর বিষণ্ণতা ও হতাশায় ভুগছিলেন, যা তাঁর চিঠিপত্র ও বন্ধুদের সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত।
- মৃত্যুর দুদিন আগে তিনি এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি এক কঠিন অবসাদে ভুগছি এবং তা থেকে পালানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনো সুফল পাচ্ছি না।’
- আউশভিৎসের ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল, যা ঘনিষ্ঠরা মৃত্যুর কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
- পুলিশ ও আদালতের তদন্তে রেলিং থেকে পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক বলে মনে না হওয়ায় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, দুর্ঘটনার পক্ষের যুক্তিগুলো হলো:
- মৃত্যুর সময় লেভির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল, যেমন সাক্ষাৎকার নির্ধারণ, নতুন প্রকাশনা প্রকল্প নিয়ে ভাবনা, যা আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেয় না।
- তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান ও নার্সের সাক্ষ্যে কোনো আত্মহত্যার চিরকুট পাওয়া যায়নি।
- অধ্যাপক দিয়েগো গাম্বেত্তার মতে, লেভি প্রোস্টেট অপারেশনের পর মাথা ঘোরা ও ভারসাম্য হারানোর সমস্যায় ভুগছিলেন, যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
- ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবার সদস্যরা প্রথমে আত্মহত্যা মনে করলেও পরে ঘটনাটি পুনর্বিবেচনা করেন।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
প্রিমো লেভির সাহিত্যকর্ম কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়, বরং মানবতা, ন্যায়বিচার ও ইতিহাসের স্মরণীয়তা রক্ষার প্রচেষ্টা হিসাবে অমর হয়ে থাকবে। তাঁর গ্রন্থগুলো বিশ্বজুড়ে অনূদিত হয়েছে এবং নাটক, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। প্যারিস ও নিউ ইয়র্কে ‘প্রিমো লেভি সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সেবা দেওয়া হয়। তুরিনে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রিমো লেভি স্টাডিজ সেন্টার’ স্থাপন করে তাঁর সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণ ও প্রচার করা হচ্ছে।
লেভির লেখনী পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে এবং গণহত্যা পরবর্তী মানবিক অবস্থা নিয়ে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। তাঁর জীবন ও কাজ অন্ধকার ও আশাবাদের অপূর্ব মিশ্রণ হিসাবে বিবেচিত, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
উপসংহার
প্রায় চল্লিশ বছর পরেও প্রিমো লেভির মৃত্যুর রহস্য অমীমাংসিত রয়েছে। সরকারি মতে আত্মহত্যা হলেও পরিবার ও অনেকে দুর্ঘটনা বলে বিশ্বাস করেন। তাঁর মৃত্যুর পেছনে আউশভিৎসের ট্রমা, ব্যক্তিগত হতাশা ও শারীরিক সমস্যা জড়িত থাকতে পারে। তবে যা-ই হোক, প্রিমো লেভি তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন এবং মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।



