কাজী মোতাহার হোসেনের হারানো অভিভাষণ: মুক্তবুদ্ধির আহ্বান ও নববর্ষের তাৎপর্য
কাজী মোতাহার হোসেনের হারানো অভিভাষণ: মুক্তবুদ্ধির আহ্বান

কাজী মোতাহার হোসেনের হারানো অভিভাষণ: মুক্তবুদ্ধির অনন্য দলিল

মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৮৮১) আজীবন মুক্তবুদ্ধিকে ধারণ করে লেখালেখি করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে চার খণ্ডে প্রকাশিত কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলী-র চতুর্থ খণ্ডে (সম্পাদনা: আবুল আহসান চৌধুরী, ১৯৯২) তাঁর সাতটি ভাষণ-অভিভাষণ সংকলিত হয়। একই সম্পাদকের সম্পাদনায় নবযুগ প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত কাজী মোতাহার হোসেন রচনাসমগ্র-এর প্রথম খণ্ডে এসব ভাষণ-অভিভাষণের সঙ্গে আরও দুটি সংকলিত হয়। তবে, আমাদের অনুসন্ধান মতে, এর বাইরেও তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিভাষণ অসংকলিত রয়ে গেছে।

অসংকলিত অভিভাষণের ইতিহাস

এই অভিভাষণটি ‘অভিভাষণ ও বর্ষবরণ’ শীর্ষক এবং এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল শাখার (বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র) পত্রিকা বই-এর চতুর্থ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায়, জুন ১৯৬৮ সালে। কাজী মোতাহার হোসেন এই অভিভাষণটি দিয়েছিলেন পুঁথিঘর আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, ১৩৭৫ বঙ্গাব্দে। পত্রিকা-সম্পাদকের টীকাভাষ্য থেকে জানা যায়, ১৩৭৫ সালের বর্ষবরণ উপলক্ষে অগ্রগণ্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পুঁথিঘর নোয়াখালীতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে অগ্রগণ্য পণ্ডিত ও সাহিত্যিকেরা অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে ঢাকা থেকে যোগ দেন কাজী মোতাহার হোসেন, গোবিন্দচন্দ্র দেব, নীলিমা ইব্রাহিম, মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন, মোতাহার হোসেন সুফী, কামরুজ্জামান প্রমুখ। কাজী মোতাহার হোসেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন, কিন্তু তাঁর জীবনী ও প্রাসঙ্গিক গ্রন্থে এ ভাষণবিষয়ক কোনো তথ্যই দেখা যায় না, যা এটি একটি হারানো দলিল হিসেবে চিহ্নিত করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুক্তবুদ্ধি-চেতনার প্রকাশ

অভিভাষণটিতে নতুনের আবাহন, জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব ও উদারনৈতিকতার প্রশ্নে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের মুক্তবুদ্ধি-চেতনার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। তিনি নববর্ষের বাণীকে নতুনকে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে বরণ করার আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। প্রকৃতি জগতের দিকে তাকালেও এর সমর্থন পাওয়া যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। আজ এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নতুনদের সমস্ত দ্বিধা ও সংশয় মন থেকে মুছে ফেলতে হবে বলে তিনি জোর দেন।

তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, “জীবনের চলার পথে ছড়িয়ে রয়েছে কাঁটার মতো অজস্র বাধা ও প্রতিবন্ধকতা। এই সমস্ত বাধা ও প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে না পারলে তরুণ ও নবীনগণ জীবনে কোন কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।” তিনি আরও যোগ করেন যে প্রাচীনপন্থীরা নতুনের অভিযানকে ভয় করে এবং তাদের যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করে, তাই নতুনদের এই বাধা অতিক্রম করার মনোবল অর্জন করতে হবে।

ধর্ম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়

কাজী মোতাহার হোসেন মুক্তমন নিয়ে নববর্ষকে বরণ করার উপর জোর দেন। তিনি বলেন, নববর্ষ উদ্‌যাপন সমস্ত প্রকার সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এবং ধর্মের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। ইসলাম ধর্মের বাণী অত্যন্ত উদার বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভালোকে, মহৎকে, সুন্দরকে জীবনে গ্রহণ করার জন্য ইসলাম তাগিদ দিয়েছে। গোঁড়ামিমুক্ত মন নিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করার আহ্বান জানান তিনি।

এই প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) বাণী স্মরণ করিয়ে দেন: “জ্ঞান অর্জনের জন্য যদি চীনদেশেও যেতে হয়, তাহলে সেখানেই যেতে হবে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ নয় এবং দূরদূরান্তে গিয়ে জ্ঞানার্জন করতে হলেও সে জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। পবিত্র কোরান শরিফে অন্ধ সংস্কার এবং গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দান না করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, “সময়ের পরিবর্তনের বহু কিছুকে আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অজস্র সুফল ভোগ করছি। ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের বিরোধ কোথায়?” তিনি সতর্ক করেন যে নিজেদের আভিজাত্য বজায় রাখা এবং হীন অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিছু লোক গোঁড়ামিকে আঁকড়ে ধরে থাকেন, কিন্তু নববর্ষ উদ্‌যাপন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হবে কোনো গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দান না করা।

বঙ্গাব্দের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

অভিভাষণের শেষ অংশে কাজী মোতাহার হোসেন বঙ্গাব্দের প্রবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে পণ্ডিত মহলে প্রধানত দুটি মত প্রচলিত আছে: একদল বলেন, আবুল ফজলের পরামর্শে সম্রাট আকবর বাংলা দেশের ফসল উৎপাদন ও খাজনা পরিশোধের পরিপ্রেক্ষিতে হিজরি সালের সাথে সমৃদ্ধ রেখে বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন; অপর দলের মতে পাঠান সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বঙ্গাব্দের প্রবর্তক।

তিনি প্রথমোক্ত মতকে গ্রহণীয় বিবেচনা করেন, কারণ অধিকাংশ গবেষকই এই মত সমর্থন করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কারও খেয়ালখুশি অনুযায়ী বঙ্গাব্দ প্রচলিত হয়নি। বঙ্গাব্দ বিজ্ঞানভিত্তিক।” পূর্বে চান্দ্ররীতি অনুযায়ী বর্ষ গণনা করা হতো, কিন্তু বাংলা দেশের বিশেষ প্রকৃতিতে এ ধরনের বর্ষ গণনায় অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছিল। সম্রাট আকবর জ্যোতিশাস্ত্রে পারদর্শী পণ্ডিত ব্যক্তিদের পরামর্শে চান্দ্ররীতি বর্জন করে সৌররীতি অনুযায়ী বর্ষ গণনার নিয়ম প্রবর্তন করেন। কাজী মোতাহার হোসেনের মতে, বঙ্গাব্দের এই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে অস্বীকার করা যায় না এবং আমাদের দেশের কাজকর্মে বঙ্গাব্দ অনুসরণ করলে সর্বক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হবে।

এই অভিভাষণটি কাজী মোতাহার হোসেনের চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে, যা মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানার্জন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারকে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরে।