বগালেক থেকে কেওক্রাডং: বান্দরবানের রোমাঞ্চকর পর্বতযাত্রার অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের ‘দার্জিলিং’ বলে পরিচিত বান্দরবান জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত কেওক্রাডং পর্বতশৃঙ্গ। রুমা, থানচি কিংবা আলীকদম উপজেলার গহিন অরণ্য ও প্রত্যন্ত এলাকা পেরিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়। বান্দরবান মিলনছড়ি পেরিয়ে ওয়াই জংশনে পৌঁছালে একদিকে থানচি আরেকদিকে রুমা উপজেলার পথ খুলে যায়। দুদিকেই রোমাঞ্চকর যাত্রার অপেক্ষা। ভয়ংকর বাঁক ও গহিন পর্বত পেরিয়ে কেওক্রাডং পর্বতে পৌঁছানো যায়।
কেওক্রাডংয়ের ইতিহাস ও উচ্চতা
কেওক্রাডং বান্দরবানে অবস্থিত দেশের সরকারিভাবে স্বীকৃত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। মারমা ভাষায় ‘কেও’ মানে পাথর, ‘ক্রা’ মানে পাহাড়, ‘ডং’ মানে ‘সবচেয়ে উঁচু’। অর্থাৎ কেওক্রাডং মানে সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়। সরকারিভাবে এটির উচ্চতা ১,২৩০ মিটার বা ৪,০৪০ ফুট। একসময় কেওক্রাডংকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হতো। পরে জরিপে তাজিংডংকে সর্বোচ্চ পর্বতের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ভ্রমণের রোমাঞ্চ ও ঝুঁকি
কেওক্রাডং যাওয়ার পথে ভয়ংকর উঁচুনিচু ও বাঁকের রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অপূর্ব সৌন্দর্য চোখ ফেরানো দায়। যাওয়া-আসার পথে অনেক বাইক উলটে পড়তে দেখা যায়। আগে পর্বতের শীর্ষে উঠতে হেঁটে ট্র্যাকিং করতে হলেও এখন পিচের রাস্তা হয়েছে। শীর্ষে ইট-পাথরের অবকাঠামো ও সীমিত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা অত্যন্ত নান্দনিক অভিজ্ঞতা। শীতের আগেই ঠান্ডা বাতাস বইতে থাকে, শীতে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হয়।
যাত্রাপথের বিবরণ
রুমা ঢুকতেই আর্মি চেকপোস্ট। কেওক্রাডং বা বগালেক যেতে এখান থেকে অনুমতিপত্র নিতে হবে। গাইড ও চাঁদের গাড়ি লাগবে। রুমা উপজেলা পেরিয়েই উঁচুনিচু রাস্তার রোমাঞ্চ শুরু। দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মুনলাই পাড়া দেখা যায় রুমা থেকে তিন–চার কিলোমিটার দূরে। ভয়ংকর রাস্তা পেরিয়ে কাটা পাহাড় বা বাংলার লাদাখ বলে পরিচিত এলাকা অতিক্রম করলে বগালেক পাওয়া যায়।
বগালেকের বিশেষত্ব
বগালেক কেওক্রাডং পাহাড়ের পাশে অবস্থিত প্রাকৃতিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত মিষ্টিপানির লেক। এটি ‘বগাকাইন হ্রদ’ নামেও পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২৪৬ ফুট বা ৩৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। লেকটির অদ্ভুত ফানেল আকৃতির গঠনের জন্য এটি ‘ড্রাগন লেক’ বা ‘লেক অব মিস্ট্রি’ হিসেবেও পরিচিত। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এই লেক অবস্থিত।
যাতায়াত ও বন্দোবস্ত
ঢাকা বা যেকোনো শহর থেকে চট্টগ্রাম বা বান্দরবান যেতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। রুমা থেকে বগালেক বা কেওক্রাডং যেতে চাঁদের গাড়ি ও গাইড লাগবে। রুমা থেকে সাত হাজার টাকায় চাঁদের গাড়ি ভাড়া নিতে হবে, যাতে ১৪ জন যেতে পারেন। প্রতি গাড়িতে একজন গাইড লাগবে, এক দিনের জন্য ৭০০ টাকা। রাত থাকলে প্রতিরাতের জন্য ৭০০ টাকা যোগ করতে হয়। প্রতি ছয় বাইকারের জন্য একজন গাইড আবশ্যক। গাইডের থাকা-খাবারের ব্যবস্থা ট্যুরিস্টকেই করতে হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে। রুমা শহরের আগে আর্মিক্যাম্প থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা দিয়ে অনুমতিপত্র নিতে হবে। বগালেকে অনুমতিপত্র গাইডের মাধ্যমে আর্মিক্যাম্পে জমা দিতে হয়।
থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা
বগালেক বা কেওক্রাডং থাকতে হলে পাহাড়িদের কটেজে থাকতে হবে। জনপ্রতি প্রতিরাতের জন্য ৩০০ টাকা খরচ হয়। কটেজেই ২০০ টাকার আশেপাশে খাওয়া যায়। গোসল করতে হলে বগালেকে করতে হবে বা পানি কিনে নিতে হবে।
এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও সৌন্দর্যময়। প্রকৃতির কোলে সময় কাটানোর জন্য কেওক্রাডং ও বগালেক আদর্শ গন্তব্য।



