প্রাত্যহিক জীবনে জমিজমা কেনাবেচা ও মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেকেই নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হন। জমি কেনা-বেচার ক্ষেত্রে অসতর্কতা দেখা দিলে প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা আইনি জটিলতার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই জমি ক্রয় বা বিক্রয়ের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। নিচে জমিজমা সংক্রান্ত ২৫টি পরিভাষা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
খতিয়ান
ভূমি জরিপের সময় জমির মালিকানার যে বিবরণ প্রস্তুত করা হয় তাকে খতিয়ান বলা হয়। খতিয়ান প্রস্তুত করা হয় মৌজাভিত্তিক। দেশে সিএস, আরএস, এসএ ও সিটি জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে।
দাগ নম্বর
জরিপ ম্যাপে জমির সীমানা শনাক্ত করার জন্য প্রতিটি জমিখণ্ডকে যে আলাদা নম্বর দেওয়া হয়, তাকে দাগ নম্বর বলা হয়। একেক নম্বরে বিভিন্ন পরিমাণ ভূমি থাকতে পারে। মূলত নম্বর অনুসারে একটি মৌজার অধীনে ভূমি মালিকের সীমানা খুঁটি বা আইল দিয়ে সরেজমিন প্রদর্শন করা হয়।
ছোটা দাগ
জরিপ বা নকশা সংশোধনের সময় কোনো দাগ নম্বর বাদ পড়ে গেলে তাকে ছোটা দাগ বলা হয়। আবার প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দুটি একত্র করে নকশা পুনঃসংশোধন করা হয় তখন যে নম্বর বাদ যায় তাকেও ছোটা বলে।
পর্চা
ভূমি জরিপকালে চূড়ান্ত প্রস্তুত করার পূর্বে ভূমি মালিকদের কাছে খসড়া খতিয়ানের যে অনুলিপি প্রদান করা হয় তাকে মাঠ পর্চা বলে। এই মাঠ পর্চা রেভিনিউ/রাজস্ব কর্তৃক তসদিব বা সত্যায়ন হওয়ার পর যদি কারো কোনো আপত্তি থাকে তাহলে তা শোনানির পর চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়। আর চূড়ান্ত খতিয়ানের অনুলিপিকে পর্চা বলে।
নামজারি
ক্রয়, উত্তরাধিকার বা অন্য কোনো সূত্রে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বলা হয়।
জমা খারিজ
যৌথ জমি বিভক্ত করে নতুন খতিয়ান সৃষ্টি করাকে জমা খারিজ বলা হয়।
মৌজা
যখন সিএস জরিপ করা হয় তখন থানা ভিত্তিক এক বা একাধিক গ্রাম, ইউনিয়ন, পাড়া-মহল্লা আলাদা করে বিভিন্ন এককে ভাগ করে ক্রমিক নাম্বার দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর বিভক্তকৃত এই প্রত্যেকটি একককে মৌজা বলে।
তফশিল
জমির মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, চৌহদ্দি ও জমির পরিমাণসহ বিস্তারিত পরিচয়কে তফশিল বলা হয়।
আমিন
ভূমি জরিপ ও নকশা তৈরির কাজে নিয়োজিত কর্মচারীকে আমিন বলা হয়।
খাজনা ও দাখিলা
জমির জন্য বার্ষিক ভিত্তিতে সরকারকে প্রদত্ত কর হলো খাজনা এবং সেই কর আদায়ের রশিদকে দাখিলা বলা হয়।
ডিসিআর
ভূমি কর ছাড়া অন্যান্য সরকারি পাওনা আদায়ের পর প্রদত্ত রশিদকে ডিসিআর বলা হয়।
কবুলিয়ত
সরকার কর্তৃক জমি বন্দোবস্ত গ্রহণ করে খাজনা প্রদানের অঙ্গীকারপত্রকে কবুলিয়ত বলা হয়।
নাল জমি
দুই বা তিন ফসলি সমতল জমিকে নাল জমি বলা হয়।
খাস জমি
সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যে জমি সরকারের পক্ষে কালেক্টর বা ডিসি তত্ত্বাবধান করেন এমন জমিকে খাস জমি বলে।
চান্দিনা ভিটি
হাট বা বাজারের অকৃষি জমির যে অংশ প্রজার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাকে চান্দিনা ভিটি বলা হয়।
ওয়াকফ ও মোতওয়াল্লি
ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক কাজে দানকৃত সম্পত্তিকে ওয়াকফ বলা হয় এবং যিনি এ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান করেন তিনি মোতওয়াল্লি। ওয়াকফ প্রশাসকের অনুমতি ব্যতিত মোতওয়াল্লি ওয়াকফ সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে না।
দেবোত্তর সম্পত্তি
হিন্দুধর্ম অনুযায়ী ধর্মীয় কাজে উৎসর্গকৃত জমিকে দেবোত্তর সম্পত্তি বলা হয়।
ফারায়েজ
ইসলামি বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম ও প্রক্রিয়াকে ফারায়েজ বলা হয়।
ওয়ারিশ
কোনো ব্যক্তি উইল ছাড়া মারা গেলে তার সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের ওয়ারিশ বলা হয়।
সিকস্তি ও পয়স্তি
নদীভাঙনে বিলীন হওয়া জমিকে সিকস্তি এবং নদী থেকে জেগে ওঠা নতুন চরভূমিকে পয়স্তি বলা হয়।
দলিল
আইনগত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য লিখিত চুক্তিপত্র বা নিবন্ধিত কাগজপত্রকে দলিল বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিজমা সংক্রান্ত এসব পরিভাষার সঠিক অর্থ জানা থাকলে দলিলপত্র যাচাই করা সহজ হয় এবং প্রতারণা বা আইনি জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়।



