কারবালার তথ্যযুদ্ধ: উমাইয়া অপপ্রচার বনাম সত্যের লড়াই
কারবালার তথ্যযুদ্ধ: উমাইয়া অপপ্রচার বনাম সত্যের লড়াই

একুশ শতকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’, ‘তথ্য যুদ্ধ’ বা ‘রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার’ শব্দগুলো আমাদের কাছে পরিচিত। কোনো সত্য ঘটনাকে আড়াল করা বা ন্যায়সংগত আন্দোলনকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে চিত্রিত করার কৌশল আমরা নিয়মিত দেখি। কিন্তু ৬১ হিজরির কারবালায় উমাইয়া শাসনযন্ত্র ঠিক একই ধরনের একটি সুপরিকল্পিত তথ্য নিয়ন্ত্রণ চালিয়েছিল। কারবালার ঘটনা তাই শুধু তরবারির যুদ্ধ ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার বনাম সত্যের একটি অসম লড়াই।

উমাইয়াদের তথ্য নিয়ন্ত্রণ কৌশল

যেকোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা টিকে থাকে তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ওপর। ইমাম হোসাইন (রা.) যখন মদিনা থেকে মক্কায় ও পরে কুফার উদ্দেশে রওনা হন, তখন দামেস্কের প্রশাসন সাধারণ মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট বয়ান গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে—ইমাম হোসাইন (রা.) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করছেন এবং বৈধ আমিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন।

কুফা ও দামেস্কের জুমার খুতবা এবং জনসভাকে উমাইয়া প্রশাসকরা এই প্রচারণার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। ধর্মীয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো ‘আনুগত্যের’ ব্যাখ্যা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ, রাসুল ও দায়িত্বশীলদের আনুগত্যের নির্দেশ আছে (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯)—উমাইয়া রাষ্ট্রযন্ত্র এই আয়াতের একপেশে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে শাসকের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাকেও ‘খারেজি’ বা ধর্মদ্রোহী কাজ বলে চালাত। (আকবর শাহ খান নাজিবাবাদি, তারিখুল ইসলাম, ২/১২০, দারে ইহয়া উত-তুরাস আল আরবি, বৈরুত, ১৯৯৭)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইবনে জিয়াদের কুফা অভিযান

কারবালার ঘটনার ঠিক আগে কুফার প্রশাসক ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ যে তথ্য যুদ্ধ চালিয়েছিলেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর দূত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) কুফায় পৌঁছালে হাজার হাজার কুফাবাসী তাঁর হাতে বায়আত নিয়েছিলেন। ইবনে জিয়াদ কুফায় প্রবেশ করেই দুটি কৌশল নেন: বিশাল শাস্তির ভয় দেখানো এবং আনুগত্য ত্যাগকারীদের জন্য পুরস্কারের প্রলোভন। (ইমাম আল-তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৫/৩৬৫, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)

এই চাপ এতটাই কার্যকর ছিল যে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) কুফার রাস্তায় একা হয়ে পড়েন। ইবনে জিয়াদ কুফার প্রধান মসজিদে দাঁড়িয়ে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের ‘বিপথগামী’ হিসেবে চিত্রিত করেন—যার ফলে কুফাবাসীদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় প্রচারণার কাছে নতি স্বীকার করেন।

জয়নবের পাল্টা বয়ান

উমাইয়াদের পরিকল্পনা ছিল কারবালার হত্যাকাণ্ডকে একটি প্রত্যন্ত মরুভূমির গোপন ঘটনা হিসেবে চাপা দেওয়া। ১০ মহররমের পর ইমাম পরিবারের বন্দী নারী ও শিশুদের কুফা থেকে দামেস্কে নিয়ে যাওয়ার সময় একে ‘বিদ্রোহ দমনের বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু এই প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ আসে হজরত জয়নব (রা.)-এর কাছ থেকে। দামেস্কের রাজদরবারে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যাদেরকে ‘বিদ্রোহী’ বলে বন্দী করা হয়েছে তারা মহানবী (সা.)-এর পরিবার। ঐতিহাসিক সূত্রে এই ভাষণের উল্লেখ আছে, যদিও এর বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/২৯৮, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৮)

এই সত্য উন্মোচন দামেস্কের সাধারণ মানুষের মধ্যে উমাইয়া প্রচারণার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।

শেষ কথা

কারবালার এই তথ্য যুদ্ধের পাঠ আজও প্রাসঙ্গিক। মহানবী (সা.) বলেছেন, সত্য মানুষকে পুণ্যের দিকে নিয়ে যায়, মিথ্যা ধ্বংসের দিকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৯৪) ক্ষমতার জোরে অপপ্রচার সাময়িকভাবে সত্য আড়াল করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে টেকে না—কারবালার ইতিহাস তার প্রমাণ। এই ঘটনা সংবাদকর্মী ও লেখকদের জন্য একটি পুরোনো কিন্তু চিরকালীন শিক্ষা: মজলুমের পক্ষে সত্য বলার দায়িত্ব, মিথ্যা বয়ানকে প্রশ্ন করার সাহস।